বিশ্ব রাজনীতির দাবার চালে মধ্যপ্রাচ্য যখন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি, ঠিক তখনই এক বিস্ফোরক দাবি সামনে এনেছে ইসরায়েল। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানি আধিপত্য ও অবরোধ বজায় রাখার নেপথ্য কারিগর, নৌ-কমান্ডার আলিরেজা তাঙসিরি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করছে তেল আবিবের সংবাদমাধ্যমগুলো।
বৃহস্পতিবার বিকেলের দিকে আসা এই খবরটি যদি সত্য হয়, তবে এটি হবে তেহরানের প্রতিরক্ষা বলয়ে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় আঘাত। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর বন্দর আব্বাসে আজ এক ভয়াবহ বিমান হামলা চালানো হয়। দাবি করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ অভিযানেই প্রাণ হারিয়েছেন প্রভাবশালী এই জেনারেল।
তবে এই স্পর্শকাতর বিষয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। এখন পর্যন্ত ইরান সরকার, দেশটির প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) কিংবা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)—কোনো পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম শীর্ষ এই সামরিক ব্যক্তিত্বের পতন হয়তো ঘটে গেছে।
কমান্ডার আলিরেজা তাঙসিরি কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ২০১৮ সালে নৌবাহিনীর শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার পর থেকেই তার প্রধান লক্ষ্য ছিল পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এর আগেও একাধিকবার তাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো, তবে প্রতিবারই তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন।
বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথের চাবিকাঠি যার হাতে, বিশ্ব অর্থনীতির নাটাইও অনেকটা তার নিয়ন্ত্রণেই থাকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই পথে কঠোর অবরোধ জারি করেছিল ইরান। আর এই পুরো অভিযানের সামনের সারিতে ছিলেন তাঙসিরি।
লন্ডনভিত্তিক সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল নিরাপত্তা সংস্থার (ইউকেএমটিও) পরিসংখ্যান বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে অন্তত ১২টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানি হামলার শিকার হয়েছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর পতাকাবাহী জাহাজগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ সংস্থাগুলো এখন এই পথ এড়িয়ে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় হু হু করে বাড়ছে দাম। ইউরোপ থেকে এশিয়া—সবখানেই সাধারণ মানুষ এই সংকটের আঁচ টের পাচ্ছেন। তাঙসিরির মতো একজন কমান্ডারের অনুপস্থিতি এই অবরোধ শিথিল করবে নাকি ইরানকে আরও প্রতিশোধপরায়ণ করে তুলবে, তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
তেহরানের রাজপথে এবং সামরিক সদর দপ্তরে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বন্দর আব্বাসের আকাশে আজ যে ধোঁয়া দেখা গেছে, তা কেবল একটি হামলার চিহ্ন নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের নতুন মোড় পরিবর্তনের সংকেত কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। যদি এই শীর্ষ কমান্ডারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়, তবে ইরান যে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলিরেজা তাঙসিরির মৃত্যু হলে তা কেবল এক ব্যক্তির অবসান হবে না, বরং হরমুজ প্রণালির ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে। এখন দেখার বিষয়, তেহরান এই খবরের জবাবে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং ওয়াশিংটন-তেল আবিব জোটের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়।

