মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে চার সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা বিধ্বংসী সংঘাত থামানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধ কখন এবং কীভাবে শেষ হবে, তা হোয়াইট হাউস নির্ধারণ করবে না; বরং এটি নির্ধারিত হবে কেবল ইরানের নিজস্ব শর্ত ও সময়সূচি অনুযায়ী।
বুধবার (২৫ মার্চ ২০২৬) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশটির একজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক-নিরাপত্তা কর্মকর্তা এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
ওই কর্মকর্তা সাফ বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধের সমাপ্তি রেখা টানার কোনো সুযোগ দেবে না ইরান। তার মতে, ওয়াশিংটন বর্তমানে বিভিন্ন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে যেসব আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে, তা আসলে ‘অযৌক্তিক’ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর পরাজয় আড়াল করার একটি অপচেষ্টা মাত্র।
২০২৫ সালের বসন্ত ও শীতকালে অনুষ্ঠিত দুই দফার আলোচনাকে ‘প্রতারণা’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তখন আলোচনার ভান করে উল্টো ইরানের ওপর সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছিল।
বুধবার একটি বন্ধুপ্রতিম আঞ্চলিক দেশের মধ্যস্থতায় আসা নতুন প্রস্তাবটিকেও ইরান ‘উত্তেজনা বৃদ্ধির কৌশল’ হিসেবে দেখছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শত্রুর ওপর ‘চরম আঘাত’ হেনে প্রতিরক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
যুদ্ধ অবসানে ইরানের ৫টি অলঙ্ঘনীয় শর্ত:
১. আগ্রাসন ও গুপ্তহত্যা বন্ধ: শত্রুপক্ষকে সব ধরনের সামরিক আগ্রাসন এবং টার্গেটেড কিলিং বা গুপ্তহত্যা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
২. নিরাপত্তার গ্যারান্টি: ভবিষ্যতে যাতে ইরানের ওপর পুনরায় কোনো যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া না হয়, তার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩. ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ: যুদ্ধের কারণে ইরানের অবকাঠামো ও অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
৪. যৌথ যুদ্ধবিরতি: এই অঞ্চলের সব ফ্রন্টে এবং লড়াইয়ে যুক্ত থাকা সব ‘প্রতিরোধ যোদ্ধা’ বা প্রক্সি গ্রুপগুলোর সঙ্গে একযোগে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে হবে।
৫. হরমুজ প্রণালিতে সার্বভৌমত্ব: বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ও আইনি অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে, যা অন্য পক্ষের প্রতিশ্রুতি পালনের গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় দ্বিতীয় দফার পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা চলাকালীন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনি এবং শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ইরান একে ‘উসকানিমূলক ও অবৈধ যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর জবাবে গত কয়েক সপ্তাহে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী ইসরায়েলি ও মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে অন্তত ৮০ বার প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে।
ইরানি ওই কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ট্রাম্প যখন চাইবেন তখনই যুদ্ধ শেষ হবে—এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। ইরান যখন মনে করবে তার শর্তগুলো পূর্ণ হয়েছে, কেবল তখনই কামান গর্জন থামাবে। মধ্যস্থতাকারীদের ইতিমধ্যেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই শর্তগুলোর বাইরে আপাতত কোনো আলোচনা সম্ভব নয়।

