ইরানের সাথে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর তিন সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। পরিস্থিতি এখন আর কেবল যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ক্রমে হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আকাশচুম্বী তেলের দাম, আন্তর্জাতিক মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট সমাপ্তি না থাকা—সব মিলিয়ে ট্রাম্প এখন এক গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ট্রাম্প বলেছিলেন, এই অভিযান হবে ‘সংক্ষিপ্ত এবং লক্ষ্যভেদী’। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। পারস্য উপসাগরে ইরান তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে বর্তমানে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েনের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে, যা তার ‘আমেরিকাকে বিদেশের যুদ্ধ থেকে দূরে রাখা’র অঙ্গীকারের সম্পূর্ণ বিপরীত।
নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে ট্রাম্প এখন ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোকে ‘কাপুরুষ’ বলে আক্রমণ করছেন। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা না করায় তিনি এই সামরিক জোটের পাশ থেকে সরে দাঁড়ানোরও হুমকি দিয়েছেন। যদিও গত শুক্রবার তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে ‘যুদ্ধে সামরিক বিজয় অর্জিত হয়েছে’, তবে রণক্ষেত্রের চিত্র বলছে উল্টো কথা। ইরান এখনো তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুদ ব্যবহার করে মার্কিন মিত্রদের নাজেহাল করে তুলছে।
সাবেক মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কৌশলী অ্যারন ডেভিড মিলার পরিস্থিতির গভীরতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “ট্রাম্প নিজেই নিজের জন্য ‘ইরান যুদ্ধ’ নামের একটি খাঁচা তৈরি করেছেন। এখন তিনি সেখান থেকে সম্মানজনকভাবে বের হওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।” হোয়াইট হাউসের অন্দরেও এখন ফিসফাস শুরু হয়েছে। উপদেষ্টাদের একটি অংশ প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধের পরিসর সীমিত করার পরামর্শ দিলেও ট্রাম্পের অনড় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ট্রাম্পের এই যুদ্ধ এখন তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখা নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ। সাধারণ মার্কিনিরা এখন প্রশ্ন তুলছেন—কেন তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং জ্বালানির দাম দূরপ্রাচ্যের এক যুদ্ধের ওপর নির্ভর করবে? রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডেভ উইলসনের মতে, “যখন মানুষ তাদের পকেট থেকে বাড়তি অর্থ গুনতে শুরু করে, তখন দেশপ্রেমের আবেগ ম্লান হতে সময় লাগে না।”
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইরানের মরণপণ প্রতিরোধের ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করা। অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে থাকা তেহরান এখন ‘ডু অর ডাই’ নীতিতে এগোচ্ছে। ইসরায়েলের সাথেও ট্রাম্পের সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; বিশেষ করে ইরানের গ্যাস ফিল্ডে হামলার বিষয়ে দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলাকেই ফুটিয়ে তুলছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এক উভয় সংকটে দাঁড়িয়ে। তিনি কি সর্বশক্তি দিয়ে ইরানি তেল কেন্দ্রগুলো দখল করতে নামবেন, যা দীর্ঘমেয়াদী এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াবে? নাকি পরাজয় মেনে নিয়ে ফিরে আসবেন, যা তাকে মিত্রদের কাছে হাসির পাত্রে পরিণত করবে? রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতিমধ্যে হাজার হাজার অতিরিক্ত মেরিন ও নৌ সেনা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হচ্ছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংঘাত সহসা থামছে না।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন মনে করেন, ট্রাম্প এখন সংবাদপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। নেতিবাচক খবর প্রচার করায় তিনি গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ‘দেশদ্রোহিতার’ অভিযোগ তুলছেন, যা আসলে তার ব্যক্তিগত হতাশারই বহিঃপ্রকাশ। যুদ্ধের কোনো প্রস্থান পরিকল্পনা (Exit Strategy) না থাকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলন এখন ইতিহাসের এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি।

