যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্প্রতি ফেরত পাঠানো বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীরা তাদের দেশে ফেরার পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘অমানবিক’ এবং ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে, প্রত্যাবাসনের সময় দীর্ঘক্ষণ ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা এবং খাবার ও পানীয়ের মান নিয়ে তারা গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
ছদ্মনাম ব্যবহার করে ফয়সাল আহমেদ নামে এক বাংলাদেশি নাগরিক বিবিসি বাংলাকে নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “এখনও আমার হাতে দাগ, কোমরে দাগ, আমার পুরো শরীরে স্পট হয়ে আছে। বাংলাদেশে বিমানবন্দরে নামার আগে ৭৫ ঘণ্টা আমাকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হয়েছিল, এমনকি বাথরুমেও যেতে দেয়নি।”
ফয়সাল জানান, তিনি পাঁচ বছর আগে ভিজিট ভিসায় বলিভিয়ায় যাওয়ার পর আর দেশে ফেরেননি। এরপর দালালদের মাধ্যমে প্রায় ছয় মাস ধরে পেরু, ইকুয়েডর, মেক্সিকো হয়ে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন এবং বৈধ হওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকেন।
মি. আহমেদ জানান, প্রথমে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন এবং তিনবার ওয়ার্ক পারমিটের আবেদন করেও তিনি ব্যর্থ হন। তিনি অভিযোগ করেন যে, আইনি সহায়তার নামে অ্যাটর্নি পরিচয় দিয়ে কিছু চক্র সেখানে বসবাসরত বাঙালিদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের পর ফয়সালের মতো অবৈধভাবে অবস্থানকারী অন্যরাও বিপদে পড়েন। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ছয় মাস আগে নিউইয়র্ক থেকে গ্রেপ্তার হন ফয়সাল। এরপর তাকে বাফেলোর একটি ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে হাতে ও পায়ে শেকল পরিয়ে আরো কয়েকজনের সঙ্গে তাকে লুইসিয়ানার একটি কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়।
কারাগারে থাকা নিয়ে ফয়সাল বলেন, “ভাই, আর কারো যেন এভাবে কারাগারে না থাকা লাগে, ছয়ডা মাস ছিলাম। যে খাবার খাইতে দিত, মানুষ পশুপাখিকেও এখন খাবার খাওয়ায় না।”
সোমবার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সামরিক ফ্লাইটে ফয়সাল আহমেদসহ মোট ৩১ জন বাংলাদেশি নাগরিক হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এই ফ্লাইটেও তাদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
ওই ফ্লাইটে থাকা আরেকজন ব্যক্তি বিবিসি বাংলাকে জানান, “বাংলাদেশের জন্য বিমানে তুলছে সকাল আটটায় কিন্তু হাতে, গলায় ও কোমরে শেকল পরানো ছিল রাত বারোটা থেকেই। এরপর প্রায় ২৭ থেকে ২৮ ঘণ্টা বিমানে ছিলাম। আমাকে বাথরুমেও যেতে দেওয়া হয়নি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন ফেরত আসা ব্যক্তি বলেন, “হাতে বেড়ি, পায়ে বেড়ি, কোমরে বেড়ি, আমেরিকা থেকে বিমানে তুলছে ৪০ ঘণ্টা পর গার্বেজের মতো ছুড়ে ফেলে গেছে বাংলাদেশের বিমানবন্দরে।”
ফেরত আসা এই ৩১ জনের মধ্যে অধিকাংশই নোয়াখালীর বাসিন্দা। এছাড়া সিলেট, ফেনী, শরিয়তপুর, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলার অভিবাসন প্রত্যাশীরাও ছিলেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে গত সাত মাসে এভাবে মোট আড়াইশোর বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যারা অবৈধভাবে দেশটিতে অবস্থান করছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, নথিপত্রহীন কাউকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফেরত পাঠানোটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, “ঘন্টার পর ঘন্টা হাতকড়া, পায়ে শেকল পরিয়ে রাখার ঘটনা অমানবিক।” তিনি উল্লেখ করেন, “পঞ্চাশ থেকে ষাট ঘণ্টা যতক্ষণ তারা ফ্লাইটে ছিলেন হাতে-গায়ে শেকল পরানো অবস্থায়। এমন পরিস্থিতি আসলে একজন ব্যক্তির মধ্যে ট্রমা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে।”
ফয়সাল আহমেদের মতো ভুক্তভোগীরা বলছেন, বাংলাদেশ সরকারের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই অমানবিক আচরণ নিয়ে আলোচনা করা এবং পদক্ষেপ নেওয়া। তিনি জোর দেন, “অবৈধভাবে কেউ থাকলে বন্দি করে ফেরত পাঠানো হোক, কিন্তু মানবিক দিকও বিবেচনায় রাখা উচিৎ।”
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, বৈধভাবে কাজের অনুমতি নিয়ে এক দেশে যাওয়ার পর সেখান থেকে অবৈধভাবে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর এই প্রবণতা দেশের শ্রমবাজারের জন্য ভালো খবর নয়।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারের তথ্যমতে, সবশেষ ফেরত আসা ৩১ জনের মধ্যে অন্তত সাতজন জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিল গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে তারা মেক্সিকো হয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন।
শরিফুল হাসান সতর্ক করে বলেন, “ব্রাজিলে কাজের নামে যাদেরকে পাঠানো হচ্ছে তাদের অধিকাংশই ব্রাজিল থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার চেষ্টা করছেন। এজন্য একেকজন ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করছেন কিন্তু ফিরছেন শূন্য হাতে।”
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের প্রবণতা রোধে নতুন করে কর্মী পাঠানোর আগে সরকারকে কঠোর নজরদারি বাড়ানো এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।

