মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা পরিস্থিতির মাঝে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। শুক্রবার (২০ মার্চ) ইস্তাম্বুলে দেওয়া এক ভাষণে তিনি নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডকে সরাসরি ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এরদোয়ানের মতে, ইসরায়েলি এই আগ্রাসন কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং গোটা বিশ্বশান্তির জন্যই এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে কেন্দ্র করে যে নজিরবিহীন হামলার সূচনা হয়েছে, তার নেপথ্যে রয়েছে নেতানিয়াহুর প্রত্যক্ষ উসকানি। তিনি অভিযোগ করেন, একটি ‘জায়নবাদী গণহত্যা নেটওয়ার্ক’ গাজায় মানবিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়ে সাধারণ মানুষকে তিল তিল করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ঘরবাড়ি ধ্বংস আর দস্যিপনার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার এই অপচেষ্টাকে রুখতে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি।
এরদোয়ানের ক্ষোভের একটি বড় অংশ ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল-আকসা মসজিদ নিয়ে। তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে দখলদার বাহিনী পবিত্র আল-আকসা ইবাদতের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। এর পাশাপাশি পশ্চিম তীরসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণবাদী নীতিকে আরও ত্বরান্বিত করছে ইসরায়েল। বিশ্বজুড়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে নেতানিয়াহু প্রশাসন তাদের নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
লেবানন পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে তুর্কি প্রেসিডেন্ট জানান, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় সেখানে ইতিমধ্যে ১ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১০ লাখ। এই মানবিক বিপর্যয়ের দায়ভার সরাসরি ইসরায়েলের ওপর চাপিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নীরব থাকায় এই দস্যিপনা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের এই দিনে শোকাতুর মুসলিম উম্মাহ, বিশেষ করে গাজাবাসীর প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন এরদোয়ান। তিনি বিশ্বাস করেন, ধৈর্য আর পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব এই সংকট কাটিয়ে উঠবে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, বর্তমান পথটি ষড়যন্ত্র আর ফাঁদে পরিপূর্ণ। তুরস্ক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সংলাপ ও কূটনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।
আঞ্চলিক উত্তেজনার মাঝেও একটি ইতিবাচক খবরের ঘোষণা দেন এরদোয়ান। তিনি জানান, তুরস্কের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ঈদ উপলক্ষে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের মধ্যে রক্তক্ষয় বন্ধ হওয়া এবং সাধারণ মানুষের শান্তিতে ঈদ পালন করতে পারাকে তিনি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সাময়িক শান্তি যেন স্থায়ী রূপ পায়।
এরদোয়ানের এই ভাষণ বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাবশালী অবস্থানের বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে শান্তি স্থাপনে মধ্যস্থতা—সব মিলিয়ে আঙ্কারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের এক অনিবার্য শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

