মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এবার এক চূড়ান্ত সংঘাতের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। ইরানের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত ‘খারগ দ্বীপ’ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে অথবা পুরোপুরি অবরুদ্ধ করতে একটি গোপন ও দুঃসাহসিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ওয়াশিংটন। তেহরানকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে বাধ্য করতেই মার্কিন প্রশাসন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপটি দখলের কথা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’কে উদ্ধৃত করে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি এক অগ্নিপরীক্ষা। তিনি ইরানের সঙ্গে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের দ্রুত সমাপ্তি চাইলেও হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে না পারা পর্যন্ত তা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধস নামার উপক্রম হয়েছে। এই অচলাবস্থা কাটানোই এখন ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।
খারগ দ্বীপ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের বিশালাকার টার্মিনালগুলোর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত ও জাহাজে তোলা হয়। ইরান উপকূল থেকে মাত্র ১৫ মাইল দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি দখল করা মানে তেহরানের অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা। তবে এই অভিযান মার্কিন সেনাদের সরাসরি বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
হোয়াইট হাউসের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমে অন্তত এক মাস ধরে ইরানি সামরিক সক্ষমতার ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়ে তাদের দুর্বল করতে হবে। এরপরই কেবল দ্বীপটি দখল করে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকারে বাধ্য করা সম্ভব হবে। মার্কিন নৌবাহিনীর তিনটি ইউনিট ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলের দিকে রওনা হয়েছে এবং পেন্টাগন আরও অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অত্যন্ত কঠোর সুরে বলেছেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত দেখতে চান। যদি এর জন্য খারগ দ্বীপ দখল করতে হয়, তবে সেটিই করা হবে। এমনকি উপকূলীয় অঞ্চলে বড় ধরনের আগ্রাসনের প্রয়োজন পড়লেও পিছু হটবে না যুক্তরাষ্ট্র।” যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি, তবে প্রস্তুতিতে কোনো খামতি রাখা হচ্ছে না।
মার্কিন সিনেটর টম কটন ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানকে ‘বিচক্ষণতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ এই পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান। অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মার্ক মন্টগোমারি সতর্ক করে বলেছেন, দ্বীপটি দখল করলেই যে ইরান শান্ত হয়ে যাবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তার মতে, স্থল অভিযানের বদলে দীর্ঘমেয়াদি বিমান হামলা এবং ট্যাংকারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়াই হবে কম ঝুঁকিপূর্ণ পথ।
উল্লেখ্য, চলতি মার্চের শেষে চীন সফরের আগেই ট্রাম্প এই যুদ্ধের একটি সম্মানজনক সমাপ্তি চেয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতায় তাকে সফর পিছিয়ে দিতে হয়েছে। শুক্রবারও মার্কিন বাহিনী খারগ দ্বীপের কয়েক ডজন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমরা যেকোনো সময় ওই দ্বীপটি দখল করতে পারি। আমি একে একটি ছোট দ্বীপ বলি; যা বর্তমানে অরক্ষিত।”
স্থল সেনা মোতায়েন নিয়ে ট্রাম্প কিছুটা রহস্য বজায় রাখলেও ইতিমধ্যে ২ হাজার ৫০০ সদস্যের একটি শক্তিশালী মেরিন এক্সপেডিশনারি ফোর্স ওই অঞ্চলের পথে রয়েছে। আরও সমপরিমাণ সদস্যের দুটি ইউনিটও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব মেরিন সেনাকে কেবল দ্বীপ দখল নয়, প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে মার্কিন দূতাবাস কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার কাজেও ব্যবহার করা হতে পারে।
খারগ দ্বীপের ভাগ্য এখন ঝুলে আছে ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত নির্দেশের ওপর। যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপে স্থল অভিযান শুরু করে, তবে তা হবে দশকের অন্যতম বড় সামরিক সংঘাত। বিশ্ব অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ এখন সেই ১৫ মাইল দূরের একটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করছে।

