রক্তাক্ত জনপদ আর ধ্বংসস্তূপের ভেতরেই ফিলিস্তিনিদের দুয়ারে এসেছিল পবিত্র ঈদুল ফিতর। কিন্তু আনন্দের এই দিনেও বঞ্চনা পিছু ছাড়েনি তাদের। ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়ে ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। শুক্রবার সকালে হাজারো মানুষ নামাজ পড়তে এসে মসজিদের রুদ্ধ দ্বারের সামনে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পূর্ব জেরুজালেমের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা আল-আকসার দিকে ছুটলেও ইসরায়েলি সৈন্যরা সব প্রবেশপথ কাঁটাতার আর ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেয়। ফলে মূল চত্বরে প্রবেশ করতে না পেরে শত শত ফিলিস্তিনি বাধ্য হয়ে মসজিদের প্রবেশদ্বার, দামাস্কাস গেট এবং সংলগ্ন রাস্তাগুলোতে জায়নামাজ বিছিয়ে ঈদের জামাত সম্পন্ন করেন।
জেরুজালেম গভর্নরেট ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক উসকানি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা (WAFA) তাদের এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এটি কেবল ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়, বরং আল-আকসাকে ফিলিস্তিনি এবং ইসলামি ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। টানা ২১ দিন ধরে মসজিদটি কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছে দখলদার বাহিনী, যা ওই অঞ্চলের ধর্মীয় স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এদিকে জেরুজালেমের বাইরে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ঈদের চিত্র ছিল আরও বেশি হৃদয়বিদারক। সেখানে কোনো আড়ম্বর নেই, নেই নতুন পোশাকের জেল্লা। ইসরায়েলি হামলায় মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া ঘরবাড়ি আর মসজিদের ধ্বংসস্তূপের মাঝেই ঈদের নামাজ আদায় করেছেন গাজাবাসী। অনেক জায়গায় দেখা গেছে, বিধ্বস্ত মসজিদের মিনারটি কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে, আর তার নিচেই খোলা আকাশের নিচে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বাস্তুচ্যুত মানুষেরা।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ যুদ্ধে গাজা উপত্যকার ধর্মীয় অবকাঠামো প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। উপত্যকার প্রায় ১ হাজার ২৪০টি মসজিদের মধ্যে ১ হাজার ১০০টিরও বেশি মসজিদ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তবুও ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান ফিলিস্তিনিরা তাদের ঐতিহ্য বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই তারা একে অপরের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন, যদিও সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে স্বজন হারানোর তীব্র যন্ত্রণা।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঈদের দিনে আল-আকসা বন্ধ করে দেওয়া এবং গাজায় ক্রমাগত হামলা ফিলিস্তিনিদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার একটি কৌশল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মসজিদের ভেতরে ঢুকতে না পেরে রাজপথে কপাল ঠেকানো এই মুসল্লিদের দৃশ্য বিশ্ববাসীর কাছে এক জোরালো প্রতিবাদ হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।
জেরুজালেমের অলিগলিতে আজ খুশির বার্তার বদলে কেবল বুটের শব্দ আর কান্নার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। যারা বছরের পর বছর ধরে আল-আকসায় ঈদের নামাজ পড়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন, তাদের সেই স্বপ্ন আজ ইসরায়েলি রাইফেলের মুখে থমকে গেছে। তবুও ফিলিস্তিনিদের কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছে—আল্লাহু আকবার। এই ধ্বনি যেন জানান দিচ্ছিল, ইট-পাথরের দেয়াল আটকে রাখা গেলেও মানুষের বিশ্বাসকে বন্দি করা অসম্ভব।
বিশ্বজুড়ে যখন মুসলিম উম্মাহ ঈদের আনন্দে মেতেছে, তখন ফিলিস্তিনের আকাশ ছিল বারুদে ঢাকা। আল-আকসার প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ মুসল্লিদের চোখে ছিল বিমর্ষতা, আর গাজার শিশুদের হাতে ছিল না কোনো খেলনা। তবুও ধ্বংসস্তূপের মাঝে তাদের এই প্রার্থনা প্রমাণ করে যে, চরম বিপর্যয়ের মাঝেও তারা তাদের সত্তা আর অধিকার ছাড়তে নারাজ।

