মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন কামানের গর্জন থামছেই না, তখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলে ঘটে গেল এক নাটকীয় পটপরিবর্তন। দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলের দিক থেকে কার্যত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে জার্মানি। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলায় ইসরায়েলকে দেওয়া অন্ধ সমর্থন আর বজায় না রাখার ঘোষণা দিয়েছে বার্লিন।
এতদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সঙ্গে সুর মিলিয়ে জার্মানিও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ওঠা গণহত্যার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে আসছিল। কিন্তু শুক্রবার (২০ মার্চ) জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তারা এই আইনি লড়াইয়ে আর তেল আবিবকে সহায়তা করার কোনো পরিকল্পনা করছে না। এই সিদ্ধান্তকে বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকরা ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক চপেটাঘাত হিসেবে দেখছেন।
জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র জোসেফ হিন্টারসেহার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তিনি সোজাসুজি জানিয়ে দিয়েছেন, “আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের পক্ষে কোনো ধরনের সরাসরি হস্তক্ষেপ জার্মানি আর করবে না।” জিউশ নিউজ সার্ভিসসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই খবরটি গুরুত্বের সাথে প্রচার করেছে।
কিন্তু হঠাৎ কেন এই অবস্থান পরিবর্তন? বার্লিনের এই ইউ-টার্নের পেছনে কাজ করছে একটি আইনি মারপ্যাঁচ। হিন্টারসেহার জানান, জার্মানি বর্তমানে নিজেই আইসিজে-তে নিকারাগুয়ার আনা একটি আলাদা মামলার মোকাবিলা করছে। নিকারাগুয়া অভিযোগ করেছে যে, ইসরায়েলকে অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে জার্মানি পরোক্ষভাবে এই গণহত্যায় সহায়তা করেছে।
“আমরা এখন নিকারাগুয়ার শুরু করা আইসিজের একটি প্রক্রিয়ার অংশ এবং আমরা এই প্রক্রিয়ার ওপরই মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি,” বলে মন্তব্য করেন হিন্টারসেহার। সহজ কথায়, নিজের ঘাড়ের ওপর মামলার বোঝা আসার পর জার্মানি এখন আর ইসরায়েলের রক্ষাকর্তা হিসেবে মাঠে নামার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তারা এখন নিজেদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই বেশি ব্যস্ত।
দীর্ঘদিন ধরে জার্মানি ইসরায়েলের প্রতি তাদের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার দোহাই দিয়ে সব ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জার্মানির এই সমর্থনকে অনেকটা ‘অপরিবর্তনীয়’ মনে করা হতো। কিন্তু গাজায় ক্রমবর্ধমান প্রাণহানি এবং আন্তর্জাতিক মহলের প্রবল চাপের মুখে বার্লিনকে এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
জার্মানির এই সরে দাঁড়ানো ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশাসনের জন্য এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ। বিশেষ করে যখন আইসিজে-তে দক্ষিণ আফ্রিকার মামলাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর পথে, তখন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশটির এমন পিছুটান ইসরায়েলকে বিশ্বমঞ্চে আরও একাকী করে দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই কূটনৈতিক মোড় পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের মুখপাত্র নাঈনি নিহত হওয়ার পর পুরো অঞ্চল যুদ্ধের কিনারে দাঁড়িয়ে, অন্যদিকে ইউরোপীয় মিত্রদের এই পিছুটান ইসরায়েলের ওপর মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানির দেখাদেখি আরও অনেক দেশ হয়তো এখন ইসরায়েলের পক্ষ ত্যাগ করার কথা ভাববে।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জার্মানি আসলে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা করছে। একদিকে মানবাধিকারের কথা বলা আর অন্যদিকে গণহত্যায় অভিযুক্ত রাষ্ট্রকে সমর্থন দেওয়া—এই স্ববিরোধিতা জার্মানির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি করেছিল। নিকারাগুয়ার মামলাটি সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে। ফলে পিঠ বাঁচাতে এখন ইসরায়েলকে ছাড়াই সামনে এগোনোর পথ খুঁজছে বার্লিন।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিচার এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই দেখার বিষয়। দক্ষিণ আফ্রিকা বারবার দাবি করে আসছে যে, গাজায় যা ঘটছে তা সুস্পষ্ট গণহত্যা। এতদিন ইসরায়েল দাবি করে আসছিল যে পশ্চিমাদের সমর্থন তাদের সঙ্গে আছে। কিন্তু জার্মানির এই সরে দাঁড়ানো প্রমাণ করল যে, যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়তে থাকলে বন্ধুরাও একসময় হাত ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
নেদারল্যান্ডসের হেগ শহর থেকে এখন সারা বিশ্বের চোখ বার্লিনের দিকে। জার্মানির এই সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো তাদের অবস্থানে অনড় থাকে কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জল্পনা। তবে আপাতত এটি পরিষ্কার যে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে কেবল রণাঙ্গনে নয়, আন্তর্জাতিক আদালতের লড়াইয়েও ইসরায়েল এখন বেশ কোণঠাসা।

