মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন হামলায় প্রকম্পিত, ঠিক সেই মুহূর্তেই তেহরান থেকে এল এক চাঞ্চল্যকর খবর। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রভাবশালী মুখ ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাঈনি নিহত হয়েছেন। শুক্রবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক যৌথ সামরিক অভিযানে তিনি প্রাণ হারান বলে দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো।
আইআরজিসি পরিচালিত সংবাদমাধ্যম ‘সেপাহ নিউজ’ এই ঘটনাকে একটি “কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলা” হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শুক্রবার শেষ রাতে “আমেরিকা-ইহুদিবাদী গোষ্ঠী” অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত আক্রমণে নাঈনি ‘শহীদ’ হয়েছেন। ২০২৪ সালে মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি পশ্চিমা বিশ্বের কাছে আইআরজিসির প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন।
ঘটনার আকস্মিকতা নিয়ে খোদ তেহরানেই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কারণ, মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জাতীয় টেলিভিশনে এক জোরালো বিবৃতিতে নাঈনিকে দেখা গিয়েছিল। সেখানে তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, “যুদ্ধকালীন চরম পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা বিন্দুমাত্র কমেনি।” সেই তেজস্বী ভাষণের রেশ কাটতে না কাটতেই তার মৃত্যুর সংবাদে খোদ আইআরজিসি সদর দপ্তরেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানাচ্ছে, শুক্রবার ভোররাত থেকে তেহরানের পূর্বাঞ্চলসহ কারাজ, কেরমান এবং বন্দর লেঙ্গেহ এলাকায় দফায় দফায় হামলা চালানো হয়েছে। তবে ঠিক কোন সুনির্দিষ্ট হামলায় নাঈনি প্রাণ হারিয়েছেন, তা এখনও স্পষ্ট করেনি ইরান সরকার। তিনি কি কোনো সামরিক স্থাপনায় অবস্থান করছিলেন, নাকি তার বাসভবন লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী হামলা (Targeted Killing) চালানো হয়েছে, তা নিয়ে জল্পনা চলছে।
৬৮ বছর বয়সী এই জেনারেল ছিলেন আইআরজিসির সেকেন্ড ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদার কর্মকর্তা। তার জন্ম ইরানের কাশান শহরে। বছরের পর বছর ধরে পর্দার আড়ালে থেকে রণকৌশল সাজানোর পর ২০২৪ সালে তিনি প্রকাশ্যে মুখপাত্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার মৃত্যু ইরানের সামরিক প্রচারযন্ত্রের জন্য এক বিশাল ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, এই হাই-প্রোফাইল হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন বা তেল আবিব থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সাধারণত এই ধরনের বিশেষ অভিযান বা টার্গেটেড হামলার পর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দীর্ঘ সময় নীরব থাকে। তবে পেন্টাগনের একটি সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তেহরানের আশেপাশে একাধিক ‘কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে’ গত রাতে হামলা চালানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জেনারেল নাঈনির মৃত্যু ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধকে এক নতুন এবং আরও বিপজ্জনক মোড়ে ঠেলে দিতে পারে। কারণ, আইআরজিসি তাদের শীর্ষ নেতাদের ওপর হামলার জবাব দিতে খুব একটা সময় নেয় না। বিশেষ করে যখন মুখপাত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নিশানা করা হয়, তখন সেটি সরাসরি সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করা হয়।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর তেহরানের রাস্তায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চাপা উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে শোকের প্রতীক হিসেবে কালো ব্যান্ড প্রদর্শন করা হচ্ছে। নাঈনির জন্মস্থান কাশান শহরেও শোকাতুর পরিবেশ বিরাজ করছে। সেখানে তার শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে নাঈনির সেই শেষ বার্তা—”ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন পুরোদমে চলছে”—এখন ইরানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। অনেকে বলছেন, তিনি হয়তো জানতেন তার ওপর হামলা হতে পারে, তাই শেষ মুহূর্তেও মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এই মৃত্যুর ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দাবানল কোথায় গিয়ে থামবে, তা এখন বড় প্রশ্ন। একদিকে বাংলাদেশিরা প্রাণ হারিয়ে কফিনে ফিরছেন, অন্যদিকে ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তির শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হচ্ছেন। কূটনীতি আর আলোচনার টেবিল এখন ধুলোয় মিশে গেছে বলে মনে হচ্ছে। পুরো অঞ্চল এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে বারুদই শেষ কথা।
বিপ্লবী গার্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জেনারেল নাঈনির রক্তের বদলা নেওয়া হবে। এই হুঁশিয়ারি বিশ্ববাজারে তেলের দাম থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, তেহরান এই অপূরণীয় ক্ষতির জবাবে বড় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয় কি না।

