দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার জল্পনা আর উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে ইরান অবশেষে নিশ্চিত করেছে যে, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রভাবশালী প্রধান এবং বর্তমানের অন্যতম প্রধান নীতি-নির্ধারক আলি লারিজানি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনীর এক অতর্কিত হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। তেহরানের পক্ষ থেকে এই তথ্য স্বীকার করার আগে ইসরায়েলই প্রথম দাবি করেছিল যে, তারা লারিজানিকে লক্ষ্য করে সফল অভিযান পরিচালনা করেছে।
বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ৩টার দিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের একটি শোকবার্তা প্রকাশ করে। সেখানে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লারিজানির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। গত মঙ্গলবার রাতে তার ওপর এই প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছিল। প্রায় একদিনের নীরবতা ভেঙে ইরান লারিজানির এই প্রস্থানকে ‘শাহাদাতের পরম গৌরব’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
নিরাপত্তা কাউন্সিলের বিবৃতিতে লারিজানিকে একজন নিবেদিতপ্রাণ যোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, “ইরান এবং ইসলামি বিপ্লবের আদর্শকে সমুন্নত রাখার আমৃত্যু সংগ্রাম শেষে, অবশেষে আলি লারিজানি তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করলেন। সত্যের ডাকে সাড়া দিয়ে, দেশ ও জাতির সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তিনি চিরবিদায় নিলেন।” এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, তেহরান এই ক্ষতিকে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং আদর্শিক এক বড় আঘাত হিসেবে দেখছে।
আলি লারিজানির এই প্রস্থান ইরানের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর লারিজানিই ছিলেন তেহরানের প্রধান কাণ্ডারি। খামেনির অনুপস্থিতিতে তিনি কার্যত বা ‘ডি ফ্যাক্টো’ সুপ্রিম লিডারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কমান্ড ছিল তারই হাতে।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ খামেনি তার মৃত্যুর আগে একটি বিশেষ দিকনির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, তার অবর্তমানে দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আলি লারিজানিই যেন নেতৃত্বের হাল ধরেন। খামেনির সেই নির্দেশ মেনে লারিজানি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের যুদ্ধ পরিচালনা এবং আঞ্চলিক কৌশল নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখছিলেন। তার মৃত্যুতে ইরান এখন নেতৃত্বের এক চরম সংকটের মুখে পড়ল।
বিশ্লেষকদের মতে, লারিজানি ছিলেন ইরানের শাসনব্যবস্থার এমন একজন স্তম্ভ, যিনি একইসঙ্গে কূটনীতি এবং সামরিক কৌশলে পারদর্শী ছিলেন। তার মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ইসরায়েলের এই সরাসরি আঘাত তেহরানের নিরাপত্তা বলয়কে কতটা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, তা এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। খামেনির পর লারিজানির মতো বড় মাপের নেতার মৃত্যু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের কম্পন সৃষ্টি করতে পারে।
বর্তমানে তেহরানের রাজপথ থেকে শুরু করে সরকারি দপ্তরগুলোতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিরাপত্তা কাউন্সিলের শোকবার্তার পর ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল বাড়ছে। লারিজানির কমান্ডে থাকা ইরানি বাহিনী এই হত্যাকাণ্ডের পাল্টা জবাব কীভাবে দেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা।
আলি লারিজানি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন ইরানের এক ক্রান্তিকালের ত্রাতা। তার এই আকস্মিক বিদায়ে তেহরান এমন এক শূন্যতায় নিমজ্জিত হলো, যা পূরণ করা নিকট ভবিষ্যতে অসম্ভব বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা।

