মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে ঘি ঢেলে দিল মার্কিন বিমান বাহিনীর এক আকস্মিক অভিযান। মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার আগেই ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের গোলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত চারজন। ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এই চাঞ্চল্যকর খবরটি নিশ্চিত করেছে।
ভোররাতের এই হামলাটি পরিচালিত হয় বাগদাদের জাদিরিয়া এলাকার একটি আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা এবং মুহূর্তেই ভবনটি ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ভবনে একটি ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোদ্ধারা অবস্থান করছিলেন। নিহত চারজনই ওই গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
হামলার নেপথ্যে ড্রোন ও দূতাবাসের সংঘাত
মঙ্গলবার ভোরের এই মার্কিন অভিযানের সূত্রপাত হয় মূলত সোমবার রাতের এক ঘটনার রেশ ধরে। সোমবার গভীর রাতে বাগদাদের গ্রিন জোনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস লক্ষ্য করে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ছোড়ে ওই ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। যদিও সেই হামলায় কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে মার্কিন দূতাবাস ভবনটি উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে, ড্রোন আছড়ে পড়ার পর দূতাবাস চত্বর থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠছে। এই ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই পেন্টাগন পাল্টা আঘাতের সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাদিনিয়ায় বিমান অভিযান পরিচালনা করে। ওয়াশিংটন একে ‘আত্মরক্ষামূলক’ এবং ‘সতর্কতামূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের দাবি
এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, সোমবারের ড্রোন হামলায় মার্কিন দূতাবাসের অত্যন্ত শক্তিশালী ‘সি-আরএএম’ (C-RAM) এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি মূলত ইনকামিং রকেট বা ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করার জন্য ব্যবহৃত হয়। সেটি অকেজো হয়ে পড়া মার্কিন নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর এই ক্ষয়ক্ষতির প্রতিশোধ নিতেই জাদিনিয়ার ভবনে সরাসরি বোমা বর্ষণ করেছে মার্কিন বাহিনী।
অস্থিতিশীল ইরাক ও আঞ্চলিক শঙ্কা
বাগদাদের রাজপথে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ইরাকি সরকারের পক্ষ থেকে এই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের বিষয়ে এখনো কোনো কড়া প্রতিক্রিয়া না পাওয়া গেলেও, স্থানীয় জনগণের মধ্যে মার্কিন বিরোধী ক্ষোভ দানা বাঁধছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই ছায়াযুদ্ধের বলি হচ্ছে সাধারণ ইরাকিরা— এমন আলোচনা এখন মুখে মুখে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাদিরিয়ায় এই চার যোদ্ধার মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। পাল্টাপাল্টি এই হামলার চক্র মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কাকে আরও উসকে দিচ্ছে। বাগদাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইরাকি বাহিনী টহল বাড়ালেও মার্কিন ও ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

