মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হওয়া যুদ্ধের মেঘে নতুন করে ঘি ঢাললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার সেই রণহুঙ্কারে সায় দেয়নি ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো। ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে সামরিক সহায়তা চেয়ে ট্রাম্প যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে সাফ ‘না’ করে দিয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং গ্রিস। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও এই তিন দেশ স্পষ্ট করেছে যে, তারা কোনো বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের অংশ হতে চায় না।
ঘটনার সূত্রপাত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি কড়া সতর্কবার্তায়। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা মিত্ররা যদি মধ্যপ্রাচ্যে প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তা প্রদান না করে, তবে ন্যাটোর (NATO) ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে পারে। মূলত মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই ট্রাম্প ন্যাটোর সদস্যপদ বা জোটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে এই ‘হুমকিতে’ টলেননি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক বিবৃতিতে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাজ্য কোনোভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর কোনো সংঘাতের সঙ্গে নিজেকে জড়াবে না। স্টারমার বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো ওই অঞ্চলে অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মিত্রদের প্রতিরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।” তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেন যে, ব্রিটেন নিজেকে কোনো ব্যাপক যুদ্ধের অংশ হতে দেবে না এবং তারা দ্রুত একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে কাজ করে যাবে।
একই সুর শোনা গেছে বার্লিন থেকেও। জার্মান সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার সঙ্গে ন্যাটোর কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। জার্মানির এক মুখপাত্র বলেন, “জার্মানি এই যুদ্ধে কোনো পক্ষ নেবে না। এমনকি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার কোনো অভিযানেও জার্মানির অংশগ্রহণ থাকবে না।” অর্থাৎ, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ সচল রাখতে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত সামরিক জোটে তারা যোগ দিচ্ছে না।
এদিকে গ্রিসও তাদের অবস্থানে অনড়। গ্রিক সরকারের মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের সামরিক অভিযানে জড়ানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছা এথেন্সের নেই। গ্রিসের এই অবস্থান ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রিস যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে পরিচিত।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বিপরীতে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজেদের সার্বভৌম স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ট্রাম্পের চাপে পড়ে তারা নিজেদের দেশের নাগরিকদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে চাইছে না। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনায় ইউরোপের এই নির্লিপ্তি ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই টানাপড়েনের ফলে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে ফাটল দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প যেখানে ন্যাটোর অস্তিত্ব রক্ষার দোহাই দিয়ে সামরিক সমর্থন চাইছেন, সেখানে ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো হবে আত্মঘাতী। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে জার্মান চ্যান্সেলর পর্যন্ত সবার সুরই এখন এক—সহায়তা নয়, বরং স্থিতিশীলতা।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যখন বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করার হুমকি দিচ্ছে, তখন মিত্রদের এই অস্বীকৃতি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে কতটা সংকটে ফেলে, তাই এখন দেখার বিষয়। ট্রাম্প তার পরবর্তী পদক্ষেপে এই দেশগুলোর ওপর নতুন কোনো চাপ প্রয়োগ করবেন কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে চলছে জোর আলোচনা।

