মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা পরিস্থিতিতে এবার সরাসরি ঘি ঢালল মার্কিন বাহিনী। ইরানের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড এবং তেলের ‘নার্ভ সেন্টার’ হিসেবে পরিচিত কৌশলগত খারগ দ্বীপে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার যুদ্ধের ১৫তম দিনে পারস্য উপসাগরের এই ক্ষুদ্র কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপে মার্কিন যুদ্ধবিমানের গর্জন বিশ্ববাসীকে এক নতুন মহাপ্রলয়ের সংকেত দিল। মাত্র ২০ বর্গকিলোমিটারের এই চুনাপাথরের দ্বীপটি ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দ্বীপটিকে ইরানের ‘মুকুট মণি’ হিসেবে বর্ণনা করলেও, ইরানি সাহিত্যিক জালাল আল-ই-আহমদ বহু আগে একে আদর করে ডাকতেন ‘অনাথ মুক্তা’ বলে। সেই মুক্তা এখন যুদ্ধের দাবানলে জ্বলছে। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, দ্বীপের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। এর ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এখন খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে।
খারগ দ্বীপের গুরুত্ব শুধু ভৌগোলিক নয়, বরং এটি ইরানের বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। এখানে রয়েছে বিশাল সব স্টোরেজ ট্যাঙ্ক, লোডিং টার্মিনাল এবং পাইপলাইনের এক জটিল মায়াজাল। ইরানের তিনটি প্রধান অফশোর তেলক্ষেত্র—আবোজার, ফরুজান এবং দোরুদ থেকে আসা অপরিশোধিত তেল এখানেই প্রক্রিয়াজাত হয়। বছরে প্রায় ৯৫ কোটি ব্যারেল তেল এই দ্বীপের মাধ্যমেই বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, খারগ দ্বীপ অচল হওয়া মানে তেহরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়া।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দম্ভভরে জানিয়েছেন, দ্বীপের প্রতিটি সামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এক রহস্যময় কৌশলী অবস্থানে থেকে তিনি জানিয়েছেন, আপাতত মূল তেল অবকাঠামো বা ইন্ডাস্ট্রিগুলো ধ্বংস করা হয়নি। ট্রাম্পের এই ‘অপেক্ষা’ আসলে এক চরম হুঁশিয়ারি। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যদি ইরান বা অন্য কোনো পক্ষ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে সামান্যতম বাধা দেয়, তবে পরবর্তী লক্ষ্য হবে ওই তেলের খনি ও রিফাইনারিগুলো।
এই হামলার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারে ঠেকেছে। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে কারণ জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। জেপি মরগানের মতো বড় বড় আর্থিক সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, ইরান যদি এখন পাল্টা আঘাত হিসেবে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করবে।
ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা হুঁশিয়ারি আসতে দেরি হয়নি। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ এর আগেই কড়া ভাষায় জানিয়েছিলেন, তাদের দ্বীপে আঘাত করা হলে ইরান আর কোনো সংযম দেখাবে না। তিনি সরাসরি ট্রাম্পকে দায়ী করে বলেছেন, এরপর যদি মার্কিন সেনাদের রক্তপাত হয়, তবে তার দায়ভার ওয়াশিংটনকেই নিতে হবে। তেহরানের এই অনড় অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তারা হয়তো কোনো বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে পেন্টাগন ইতোমধ্যে এই অঞ্চলে প্রায় ২,৫০০ নৌসেনাসহ অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস ত্রিপোলি’ মোতায়েন করেছে। পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি এখন রণতরী আর যুদ্ধবিমানের চক্করে অশান্ত। দুপক্ষের এই মুখোমুখি অবস্থান যে কোনো মুহূর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যা সামলানোর ক্ষমতা হয়তো কারো হাতে থাকবে না।
বর্তমানে খারগ দ্বীপের আকাশে শুধু ধোঁয়া আর আগুনের লেলিহান শিখা। যে দ্বীপটি একসময় ইরানের সমৃদ্ধির প্রতীক ছিল, সেটি এখন পরাশক্তিগুলোর দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে। ওদিকে সাধারণ ইরানিদের মধ্যে কাজ করছে তীব্র ক্ষোভ ও দেশপ্রেমের মিশ্র অনুভূতি। তারা মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অস্তিত্বের মূলে আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে, মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে একটি মধ্যস্থতায় পৌঁছানোর জন্য, যদিও সেই পথ এখন অনেকটা রুদ্ধ।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের চূড়ান্ত পর্যায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ প্রায়শই হিতে বিপরীত হয়। হরমুজ প্রণালির মতো সংবেদনশীল রুট যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার আঁচ শুধু তেহরান বা ওয়াশিংটনে নয়, বরং বেইজিং থেকে লন্ডন—সবার গায়েই লাগবে। ‘অনাথ মুক্তা’ আজ বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে দামি আর বিপজ্জনক বস্তুতে পরিণত হয়েছে।
পরিশেষে, মধ্যপ্রাচ্যের এই আগ্নেয়গিরি কখন বিস্ফোরিত হবে, তা কেউ জানে না। খারগ দ্বীপের ওপর মার্কিন হামলার এই ক্ষত ইরান সহজে ভুলবে না। পারস্য উপসাগরের শান্ত জলরাশি এখন কেবলই পরবর্তী সাইরেনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এই যুদ্ধ কি তেলের খনিগুলো গ্রাস করবে, নাকি কোনো অলৌকিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আগুনের শিখা নিভে যাবে—পুরো পৃথিবী এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায় রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে।

