মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে সংঘাতের আগুন এবার সরাসরি বিশ্বের জ্বালানি ধমনীতে আঘাত হেনেছে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপে মার্কিন বিমান হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলগত ফুজাইরাহ বন্দরে পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। শনিবার (১৪ মার্চ) বিকেলের এই হামলার পর ফুজাইরাহ বন্দরের আকাশে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
সংঘাতের এই নতুন মোড় শুরু হয় যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খারগ দ্বীপে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করেছে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দেয়। তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাধারণ নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতিতে জানায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের জ্বালানি স্থাপনাগুলো এখন তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফুজাইরাহ বন্দর এলাকায়—যা আমিরাতের অন্যতম বৃহত্তম তেল মজুদ ও বাণিজ্য কেন্দ্র—বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ড্রোনগুলো প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ তেল স্থাপনার ওপর পড়লে সেখানে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। যদিও ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পর্কে আমিরাত সরকার এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান এখন ‘সর্বাত্মক জ্বালানি যুদ্ধ’ শুরু করেছে। চলতি মাসের শুরু থেকেই কুয়েত থেকে ওমান পর্যন্ত বিস্তৃত উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান তেল ও গ্যাস শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে তেহরান। এর আগে সৌদি আরবের রাস তনুরা এবং কাতারের রাস লাফান গ্যাস ফিল্ডেও রহস্যময় হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ইরান ইতিমধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হতো। এই নৌপথ বন্ধ হওয়া এবং প্রধান শোধনাগারগুলোতে হামলার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের তেল অবকাঠামো পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিলেও, তেহরানের পাল্টা আঘাত বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তারা সহজে পিছু হটবে না। আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কোনো আস্তানা বা তাদের সহযোগী দেশগুলোর তেল স্থাপনা নিরাপদ থাকবে না।
সংঘাতের এই বিস্তৃতি কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। ফুজাইরাহর আকাশে উড়তে থাকা ধোঁয়ার মেঘ যেন সেই সংকটেরই প্রতিচ্ছবি।

