মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রণক্ষেত্রে যখন বিশ্বশক্তির নজর নিবদ্ধ, ঠিক তখনই পূর্ব এশিয়ায় নতুন করে অস্থিরতার জানান দিলেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন। দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন করা মার্কিন অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘থাড’ (THAAD) সরিয়ে নেওয়ার গুঞ্জনের মধ্যেই জাপান সাগরে একের পর এক ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে পিয়ংইয়ং। শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ২০ মিনিটে রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ের নিকটবর্তী এলাকা থেকে এই শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উৎক্ষেপণ করা হয়।
জাপানের কোস্টগার্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই নজিরবিহীন উৎক্ষেপণের খবর নিশ্চিত করেছে। পিয়ংইয়ংয়ের পক্ষ থেকে এই শক্তি প্রদর্শনকে নিয়মিত মহড়া বলা হলেও এর নেপথ্যে রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, ঠিক সেই সুযোগেই সিউল ও টোকিওকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে রাখলেন কিম।
দীর্ঘ এক দশক আগে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য পরমাণু হামলা রুখতে দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘টার্মিনাল হাই-অল্টিচ্যুড এরিয়া ডিফেন্স’ বা থাড মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সম্প্রতি পেন্টাগন সিউলকে জানিয়েছে যে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই ব্যবস্থাটি জরুরি ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তে মিত্র দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রভাবশালী দৈনিক ‘জুংআং’ এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কিম জং উনের নির্দেশে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাগরে আছড়ে পড়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জায়ে মিউং প্রকাশ্যেই মার্কিন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ সিউলের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। ঠিক এই স্পর্শকাতর সময়ে উত্তর কোরিয়ার ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ যেন দক্ষিণ কোরিয়ার সেই আশঙ্কাকেই বাস্তব রূপ দিল।
উল্লেখ্য, উত্তর কোরিয়া গত দুই দশক ধরে এই অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে আসলেও একই দিনে এতগুলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা বিরল। ২০০৬ সাল থেকে দেশটির ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পিয়ংইয়ং যে তাদের সামরিক সক্ষমতা বিন্দুমাত্র কমায়নি, শুক্রবারের ঘটনা তারই প্রমাণ। বিশেষ করে জাপান সাগর ও কোরিয়া প্রণালীতে এই মহড়া আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া সম্ভবত মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই শূন্যস্থানকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড সরিয়ে নেওয়া হলে এই অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যে ফাটল তৈরি হবে, তার সুবিধা নিতে পিয়ংইয়ং পিছপা হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং অন্যদিকে দূরপ্রাচ্যে উত্তর কোরিয়ার এই রণংদেহী মূর্তি বিশ্বনেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে।

