বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে মুখ খুলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘আইটিভি’-কে দেওয়া এক বিশেষ ভিডিও সাক্ষাৎকারে জয় জানিয়েছেন, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনকে তিনি স্বীকৃতি না দিলেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই।
শনিবার ভোরে প্রচারিত এই সাক্ষাৎকারে জয় বলেন, “আমি সবসময় আলোচনায় বিশ্বাস করি। বিষয়টি যত কঠিনই হোক বা প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, সংলাপই আমার পথ।” তিনি স্পষ্ট করেন যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের স্থিতিশীলতার প্রয়োজনে সব পক্ষকে এক টেবিলে আসা উচিত। তবে এই উদার মনোভাবের সমান্তরালে তিনি নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে তুলেছেন তীক্ষ্ণ প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত জয় এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, আওয়ামী লীগের মতো দেশের অন্যতম বৃহত্তম ও প্রগতিশীল শক্তিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী এই শূন্যতায় তাদের প্রকৃত জনসমর্থনের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে। জয় প্রশ্ন তোলেন, “যুক্তরাজ্যে যদি টোরি বা লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের নিষিদ্ধ করে নির্বাচন দেওয়া হতো, তবে কি বিশ্ব তাকে গ্রহণ করত?”
সাক্ষাৎকারে উঠে আসে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগ আমলের নানা অভিযোগের প্রসঙ্গ। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে জয় বলেন, ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর দায় এককভাবে আওয়ামী লীগের ওপর চাপানো ঠিক নয়। তাঁর দাবি, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও ছিলেন। তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যথাসময়ে সংলাপে না বসাকে তিনি সরকারের এক ধরণের ব্যর্থতা হিসেবে স্বীকার করে নেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়ে জয় জানান, তিনি এটি নিয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন নন। তাঁর বিশ্বাস, দেশের অন্তত অর্ধেক মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নেয়নি। শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে জয় বলেন, “আমার কোনো সন্দেহ নেই, মা একদিন অবশ্যই দেশে ফিরবেন। তাঁর প্রায় পুরো জীবনই বাংলাদেশে কেটেছে এবং সেখানেই তিনি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বর্তমানে ভারতই তাঁর জন্য নিরাপদ জায়গা।”
নিজের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে জয় আইটিভি-কে বলেন, তাঁর ক্ষমতার প্রতি কোনো মোহ নেই। প্লট দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, “তারেক রহমান দণ্ডিত হয়েও এখন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে এসব পরিস্থিতি চিরস্থায়ী হয় না।” যদি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন, তবে কি তিনি মামলা প্রত্যাহারের অনুরোধ করবেন? এমন প্রশ্নে জয় বলেন, “এটি দলের সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলতে এবং কাজ করতে আমার কোনো বাধা নেই।”
বাংলাদেশে পরিবারতান্ত্রিক বা বংশানুক্রমিক রাজনীতির সমালোচনা নিয়ে জয় বলেন, এটি কোনো চাপিয়ে দেওয়া বিষয় নয়। যদি তৃণমূলের কর্মীরা কাউন্সিলে বারবার তাঁদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন, তবে তাকে পরিবারতন্ত্র বলা যায় না। তিনি দাবি করেন, তাঁর মা (শেখ হাসিনা) তাকে বহুবার সংসদ সদস্য হওয়ার বা নির্বাচনে দাঁড়ানোর উৎসাহ দিলেও তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে জয় বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের স্বাধীনভাবে ঘোরার সুযোগ না থাকায় তাঁদের দেওয়া মূল্যায়নে বাস্তবতার প্রতিফলন নাও থাকতে পারে। নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

