দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে বড় ধরণের পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানই হতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচন-পরবর্তী এই প্রথম আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল যখন এই ঘোষণা দিচ্ছিলেন, তখন মঞ্চে তাঁর পাশেই উপবিষ্ট ছিলেন তারেক রহমান। করতালিমুখর মিলনায়তনে ফখরুল বলেন, “বিগত কয়েকটি দিন ও নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করেছে যে তারেক রহমান কেবল আমাদের দলের কাণ্ডারি নন, তিনি ১৮ কোটি মানুষের ঐক্যবদ্ধ আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন।”
বিএনপি মহাসচিব তাঁর বক্তব্যে এবারের নির্বাচনকে ‘উদারপন্থী গণতন্ত্রের বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর এই ভোট ছিল জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধারের চূড়ান্ত পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় দেশের মানুষ তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছে। ফখরুল উল্লেখ করেন, “বিএনপি আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ। এই ঐক্যই আমাদের সামনের দিনের কঠিন পথ চলায় পাথেয় হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান নিজেও বক্তব্য রাখেন। প্রথমে ইংরেজিতে এবং পরে বাংলায় দেওয়া ভাষণে তিনি দেশবাসীকে ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “বিজয় মানেই প্রতিহিংসা নয়; বরং এখন সময় দেশ গড়ার। আমাদের ওপর যে বিশাল দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তা পালনে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।” বিদেশি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করেন যে, তাঁর সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে স্থান পাবে বাংলাদেশের স্বার্থ’।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রায় সব শীর্ষ নেতাই উপস্থিত ছিলেন। মঞ্চে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতো প্রবীণ নেতাদের উপস্থিতি দলের অভ্যন্তরীণ সংহতির বার্তা দেয়। বিশেষ করে তারেক রহমানের হবু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই আনুষ্ঠানিক পরিচিতি আগামী ১৬ বা ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় শপথ অনুষ্ঠানের আগে রাজনৈতিক গুঞ্জন ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মির্জা ফখরুলের এই ঘোষণা কেবল একটি রাজনৈতিক পদবীর স্বীকৃতি নয়, বরং এটি রাজপথের দীর্ঘ লড়াইয়ের একটি আনুষ্ঠানিক পরিণতি। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্ষমতায় ফেরার এই সন্ধিক্ষণে তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সচল করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা।
সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা চলছে এবং আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে আলোচনার পর শপথের চূড়ান্ত সময়সূচী জানানো হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। আপাতত সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ থাকলেও মির্জা ফখরুলের কড়া নির্দেশ—কোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা বা বাড়াবাড়ি বরদাশত করা হবে না।

