মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক চরম উত্তেজনার আবহে ইরানে সম্ভাব্য শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রকাশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, তেহরানে বর্তমান শাসনের অবসান ঘটানোই হবে এই মুহূর্তে “সবচেয়ে ইতিবাচক ঘটনা”। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরপরই পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দ্বিতীয় এবং বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড’ মোতায়েন করেছে, যা ওই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের সামরিক শক্তির এক অভূতপূর্ব মহড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগ সামরিক ঘাঁটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ট্রাম্প। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ইরানের শাসন পরিবর্তন হতে পারে—আর মনে হচ্ছে এটাই হবে সেরা সমাধান।” তেহরানের বর্তমান নেতৃত্বের স্থলাভিষিক্ত কে হবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প রহস্যময় হাসিতে বলেন, “বিকল্প লোক আছে।” তার এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, হোয়াইট হাউস পর্দার আড়ালে কোনো বড় পরিবর্তনের নীল নকশা নিয়ে কাজ করছে।
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান কেবল বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ রণতরী বহরের সঙ্গে যোগ দিতে ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে রওনা হয়েছে বিশ্বের সর্বাধুনিক রণতরী জেরাল্ড আর. ফোর্ড। এর সঙ্গে থাকছে গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং অত্যাধুনিক নজরদারি বিমানের এক বিশাল বহর। ট্রাম্পের ভাষায়, “যদি কোনো সম্মানজনক চুক্তি না হয়, তবে আমাদের এই বিশাল শক্তির প্রয়োজন পড়বে।”
এদিকে, সামরিক উত্তেজনার সমান্তরালে কূটনৈতিক তৎপরতাও সমানতালে চলছে। রয়টার্সের সূত্রমতে, আগামী মঙ্গলবার জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। একই দিনে ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও পৃথক বৈঠকে বসবেন এই দুই ঝানু কূটনীতিক। অর্থাৎ, ট্রাম্প প্রশাসন একইসাথে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের দুই বড় সংকট সমাধানে আক্রমণাত্মক কূটনীতি বেছে নিয়েছে।
ইরানের ওপর ট্রাম্পের এই ক্ষোভের মূলে রয়েছে তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া সহায়তা। ট্রাম্পের মতে, দীর্ঘ ৪৭ বছর ধরে ইরান কেবল আলোচনার নাম করে সময়ক্ষেপণ করেছে। তিনি বলেন, “এই দীর্ঘ সময়ে আমরা অনেক জীবন হারিয়েছি; বহু মানুষ হাত-পা কিংবা মুখমণ্ডল হারিয়ে পঙ্গু হয়েছে। আর কতদিন আমরা এভাবে চলব?” তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নতুন চুক্তিতে না আসে, তবে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত বছরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বেশ কিছু পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে সেই স্থাপনাগুলোতে কেবল “ধুলোবালু” অবশিষ্ট আছে। তেহরান অবশ্য পাল্টা হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছে, যার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক বিশাল যুদ্ধের কিনারে দাঁড়িয়ে। যদিও ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্তে আলোচনায় বসার আগ্রহ দেখিয়েছে, তবে তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো ধরণের দরকষাকষি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাই ট্রাম্পকে ইরানে শাসন পরিবর্তনের বিষয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার চেয়ে ইরানের পরিস্থিতি হবে অনেক বেশি জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী। ট্রাম্পের এই “ম্যাক্সিমাম প্রেসার” বা সর্বোচ্চ চাপের নীতি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের দামামা বাজাবে নাকি তেহরানকে টেবিলের শর্তে নিয়ে আসবে, তা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
সাউথ চায়না সি থেকে শুরু করে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত মার্কিন রণতরীগুলোর এই বিচরণ প্রমাণ করে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্ব মানচিত্রের পুরোনো ছকগুলো নতুন করে আঁকতে চান। তবে তেহরানের কঠোর মনোভাব এবং ট্রাম্পের “শাসন পরিবর্তন” মন্ত্র—সব মিলিয়ে বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজার ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য সামনের দিনগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে চলেছে।

