আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে রণকৌশল ও নিরাপত্তা নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান স্পষ্ট করে বলেছেন, নির্বাচনে কেউ যদি বিশৃঙ্খলা বা জবরদস্তির চেষ্টা করে, তবে সাধারণ জনগণই তাদের রুখে দেবে। এমনকি বিএনপিও যদি এমন কোনো ভুল করে, তবে জনগণ কাউকেই ছাড় দেবে না।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে বিএনপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ জানাতে সেখানে যান।
বৈঠক শেষে নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে কিছু এলাকায় অর্থের প্রভাব ও বিরোধী নেতাকর্মীদের ধরপাকড় বেড়েছে। তিনি জানান, ফেনী-১ আসনে ভোটারদের টাকা দেওয়ার ভিডিও ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে। এছাড়া ময়মনসিংহ, রামু, বগুড়া, লক্ষ্মীপুর এবং সৈয়দপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত নেতাদের বেআইনিভাবে আটকের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপি নেতার দাবি, এই সব অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও ভিডিও ফুটেজ তারা নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশেষ করে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ৭৪ লাখ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানের আটকের ঘটনাটি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। এই প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদের একটি কথিত বক্তব্য নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন নজরুল ইসলাম খান। গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই বক্তব্যে দাবি করা হয়েছিল— টাকার উৎস বৈধ হলে প্রয়োজনে ৫ কোটি টাকা বহন করলেও সমস্যা নেই।
এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে বিএনপি নেতা বলেন, “নির্বাচন কমিশন যেখানে বিকাশে টাকা পাঠানোর সীমা বেঁধে দিয়েছে যাতে ভোট কেনা-বেচা না হয়, সেখানে এমন মন্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক ও রহস্যজনক।” যদিও ইসি সচিব পরবর্তীতে দাবি করেছেন যে তাকে ‘মিসকোট’ করা হয়েছে, তবে নজরুল ইসলাম খান বিষয়টি সাংবাদিকদের খতিয়ে দেখতে অনুরোধ করেন। একইসঙ্গে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কেন তিনি নিজে থেকে কাস্টমসের দোহাই দিয়ে এই অর্থের পক্ষে সাফাই গাইতে গেলেন?
নির্বাচন ঘিরে প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে বিএনপি ওয়াকিবহাল। নজরুল ইসলাম খান সতর্ক করে বলেন, যারা বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তন চায় না বা যারা নিশ্চিত পরাজয় জেনেছে, তারা শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে পারে। তিনি নির্বাচন কমিশনকে ‘শক্ত অবস্থানে’ থেকে নিরপেক্ষতা প্রমাণের আহ্বান জানান।
বিগত ১৬ বছরের সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, জনগণ গণতন্ত্র ফিরে পেতে উন্মুখ হয়ে আছে। নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসির প্রধান দায়িত্ব। তিনি আরও জানান, দুর্গম এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যালট বক্স পরিবহনের সময় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রিসাইডিং অফিসারদের ব্যক্তিগত জিম্মার পরিবর্তে প্রকাশ্য স্থানে পোলিং এজেন্টদের সামনে ব্যালট বক্স রাখার দাবি জানান তিনি।
বিএনপির এই প্রবীণ নেতার কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস ও সতর্কতার সংমিশ্রণ। তিনি মনে করেন, জনগণ যদি একবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়, তবে সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যাবে। তবে নির্বাচনের আগমুহূর্তে এই ধরনের ধরপাকড় ও টাকার খেলা বন্ধ না হলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

