পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিতে এখন বারুদের গন্ধ। তেহরানের আকাশে ঘনীভূত হচ্ছে অনিশ্চয়তার মেঘ। এমন এক স্নায়ুচাপের মুহূর্তে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসের এক দীর্ঘতম ঐতিহ্যে ছেদ পড়ল। দীর্ঘ ৩৭ বছরের এক অটুট রীতি ভেঙে জনসমক্ষে আসা থেকে বিরত থাকলেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকে খামেনি কখনোই তার পূর্বনির্ধারিত সূচি থেকে বিচ্যুত হননি। বিশেষ করে দেশটির বিমানবাহিনীর কমান্ডারদের সঙ্গে বার্ষিক সাক্ষাৎ ছিল তার জন্য এক অনড় প্রথা। এমনকি বিশ্বজুড়ে যখন কোভিড-১৯ মহামারির প্রকোপ চলছিল, তখনও তিনি এই বৈঠক এড়িয়ে যাননি। কিন্তু ২০২৬ সালের এই উত্তাল ফেব্রুয়ারিতে সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটল।
লন্ডন-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিমানবাহিনীর বার্ষিক অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন খামেনি। তার এই আকস্মিক অনুপস্থিতি কেবল তেহরানের অন্দরেই নয়, বরং সারা বিশ্বের কূটনীতিবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রশ্ন উঠছে, এই নীরবতা কি কোনো বড় ঝড়ের পূর্বাভাস?
ঐতিহাসিকভাবেই ৮ ফেব্রুয়ারির এই দিনটি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৯ সালের এই দিনে তৎকালীন পাহলভি রাজবংশের আনুগত্য ত্যাগ করে একদল বিমানবাহিনী কর্মকর্তা রুহুল্লাহ খোমেনির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। সেই বিপ্লবের পর থেকে প্রতি বছর এই দিনে বিমানবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনুগত্য পুনর্নিশ্চিত করেন।
এ বছর খামেনির পরিবর্তে সেনাবাহিনীর বিমানবাহিনীর কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান স্টাফ কর্মকর্তা আবদোলরহিম মুসাভি। সর্বোচ্চ নেতার মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের এমন একটি প্রতীকী অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকা কেবল শারীরিক অসুস্থতা নয়, বরং বড় কোনো কৌশলগত নিরাপত্তার সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে খামেনির এই সিদ্ধান্তকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্ক এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে আসা ক্রমাগত সামরিক হামলার হুমকি ইরানকে এক কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আবদ্ধ হতে বাধ্য করেছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির জনসমক্ষে না আসার পেছনে সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলা বা ড্রোন হামলার আশঙ্কা থাকতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সর্বোচ্চ নেতাকে বর্তমানে কোনো সুরক্ষিত বা গোপন অবস্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তেহরানের কর্মকর্তাদের ভাষায়, “শত্রুর গতিবিধি এখন আর কেবল ছায়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তারা সরাসরি আঘাতের ছক কষছে।”
তেহরান বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো আঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে জ্বালিয়ে দেবে। তাদের দাবি, “যুক্তরাষ্ট্র যদি এবার যুদ্ধ শুরু করে, তবে তার আগুন কেবল ইরানের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না।” এই কঠোর হুঁশিয়ারি মূলত ২০২৫ সালের সেই রক্তক্ষয়ী ১২ দিনের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেওয়া হচ্ছে, যা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল।
যদিও সেই যুদ্ধের পর একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পালিত হচ্ছিল, কিন্তু ওয়াশিংটনের বর্তমান অবস্থান পরিস্থিতিকে পুনরায় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাইডেন প্রশাসনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণ ইরানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প চাচ্ছেন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকেও আলোচনার টেবিলে আনতে, যা ইরান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার—তারা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। তেহরানের উচ্চপদস্থ এক কূটনীতিকের মতে, “আমাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কোনো দর কষাকষির বিষয় নয়।” এই অনড় অবস্থানের কারণে দুই পক্ষের মধ্যেই এখন পাল্টাপাল্টি বিমান হামলার হুমকি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামরিক শক্তির প্রদর্শনীতে পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। গত জানুয়ারির শেষ দিকে পারস্য উপসাগরের সন্নিকটে আরব সাগরে মোতায়েন করা হয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। এটি কেবল একটি জাহাজ নয়, বরং এটি একটি ভাসমান সামরিক ঘাঁটি যা কয়েক মিনিটের নোটিশে তেহরানে আঘাত হানতে সক্ষম।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জর্ডানের মুয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে এক ডজন শক্তিশালী এফ-১৫ যুদ্ধবিমান। শুধু তাই নয়, সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে ঘাতক এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং স্থলভাগে বিধ্বংসী হামলা চালাতে সক্ষম এ-১০সি থান্ডারবোল্ট-২ বিমান। এই সমাবেশ স্পষ্ট করে দেয় যে, পেন্টাগন কোনো বড় ধরনের অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত সাম্প্রতিক চিত্রগুলো আরও উদ্বেগজনক তথ্য দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস ডেলবার্ট ডি ব্ল্যাক এখন লোহিত সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরের ওপর ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালাচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীর এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোন। আকাশসীমায় ই-১১এ এবং পি-৮ পসেইডনের মতো গোয়েন্দা বিমানের উপস্থিতি ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চরম চাপে রেখেছে।
ইরানের অভ্যন্তরে এই নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। রাজপথে সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধের আতঙ্ক যেমন আছে, তেমনি আছে প্রতিরোধের সংকল্প। তেহরানের স্থানীয় এক সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শহরের পরিবেশ এখন থমথমে। সবাই জানে যে কোনো সময় কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। খামেনির অনুপস্থিতি সেই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।”
আন্তর্জাতিক মহল এখন তাকিয়ে আছে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি খামেনি দীর্ঘ সময় অন্তরালে থাকেন, তবে তা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো এই অনুপস্থিতিকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে, যদিও সাধারণ মানুষ সেই ব্যাখ্যায় আশ্বস্ত হতে পারছে না।
ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের বিষয় নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি বা পারস্য উপসাগরের তেল সরবরাহ রুটের জন্য এক বিশাল হুমকি। যদি সত্যিই কোনো সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তবে জ্বালানি তেলের বাজারে যে ধস নামবে, তা সামলানো বিশ্বের কোনো শক্তির পক্ষে সম্ভব হবে না।
আপাতত পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি নেই। কূটনৈতিক আলোচনার দুয়ারগুলো প্রায় বন্ধ। বন্দুকের নলে এখন কেবল আঙুল রাখার অপেক্ষা। আয়াতুল্লাহ খামেনির ৩৭ বছরের প্রথা ভাঙা কি কেবল নিরাপত্তার খাতিরে, নাকি তিনি পর্দার আড়ালে থেকে বড় কোনো যুদ্ধের ছক কষছেন—তা সময়ই বলে দেবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে কালো মেঘ জমেছে, তা সহজে সরার লক্ষণ নেই।

