মার্কিন ধনকুবের এবং কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনকে ঘিরে রহস্যের ডালপালা যেন কিছুতেই থামছে না। ২০১৯ সালে জেলখানায় রহস্যজনক মৃত্যুর পরও তার জীবনের অন্ধকার অধ্যায়গুলো একের পর এক বেরিয়ে আসছে। সম্প্রতি মার্কিন আদালত থেকে এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট হাজার হাজার নতুন নথি প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন গুঞ্জন শুরু হয়েছে—এপস্টেইন কি আসলে রাশিয়ার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতেন?
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে সরাসরি ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে নথিতে রাশিয়ার নাম বারবার আসায় এবং বিশেষ করে পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো বিষয়টি নিয়ে তদন্তের ঘোষণা দেওয়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন তোলপাড় শুরু হয়েছে।
ক্রেমলিনের কড়া জবাব
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়—এপস্টেইন কি রাশিয়ার এজেন্ট ছিলেন? উত্তরে পেসকভ বেশ কিছুটা উপহাসের সুরে বলেন, “এই তত্ত্ব বা ষড়যন্ত্র নিয়ে অনেক কৌতুক করার লোভ হচ্ছে আমার। কিন্তু অবাস্তব এই বিষয়ে সময় নষ্ট না করাই ভালো।”
পেসকভ এর আগেও দাবি করেছিলেন যে, যৌন কেলেঙ্কারির দায়ে অভিযুক্ত এই অর্থলগ্নিকারীর কাছ থেকে ক্রেমলিন কখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ পায়নি। তবে ফাঁস হওয়া নথির চিত্র কিছুটা ভিন্ন কথা বলছে।
পুতিনের সাথে সাক্ষাতের তীব্র বাসনা
আদালতের প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, জেফ্রি এপস্টেইন একাধিকবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে পুতিনের সাথে একটি বৈঠক আয়োজনের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন।
যদিও এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে পুতিন ও এপস্টেইনের মধ্যে কোনো বৈঠক আদতে হয়েছিল। তবে এপস্টেইনের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট থেকে উদ্ধার করা তথ্যে পুতিনের নাম অসংখ্যবার এসেছে। যার বেশিরভাগই ছিল পুতিনকে নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, যা এপস্টেইন নিয়মিত সংগ্রহ করতেন এবং তার ওপর ভিত্তি করে রুশ সরকারের উচ্চপদস্থদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করতেন।
নারী পাচার ও রুশ কানেকশন
নথির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে পাচারের উদ্দেশ্যে রাশিয়া থেকে তরুণী ও নারীদের সংগ্রহে এপস্টেইনের ব্যাপক তৎপরতা। নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, এপস্টেইন রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সুকৌশলে নারীদের সংগ্রহ করতেন এবং তাদের নিজের ব্যক্তিগত দ্বীপে বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে পাঠাতেন।
পোল্যান্ডের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন খতিয়ে দেখছে যে, এই নারী পাচার চক্রের আড়ালে এপস্টেইন কি রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে কোনো গোপন সমঝোতায় ছিলেন কি না। পোল্যান্ডের আশঙ্কা, এপস্টেইন হয়তো পুতিনের ঘনিষ্ঠদের হাতে পশ্চিমা প্রভাবশালীদের গোপন তথ্য তুলে দেওয়ার কাজ করতেন।
নস্টালজিক না কি পরিকল্পিত?
বিল গেটস থেকে শুরু করে প্রিন্স অ্যান্ড্রু—এপস্টেইনের বন্ধু তালিকায় ছিলেন বিশ্বের ক্ষমতাধর সব ব্যক্তি। এখন প্রশ্ন উঠছে, একজন সাধারণ অর্থলগ্নিকারীর কেন পুতিনের মতো নেতার সাথে দেখা করার এত প্রয়োজন ছিল? পশ্চিমা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, এপস্টেইন হয়তো রাশিয়ার ‘হানি ট্র্যাপ’ বা নারীঘটিত ফাঁদ ব্যবহার করে পশ্চিমা নেতাদের তথ্য সংগ্রহ করতেন, যা সরাসরি মস্কোর স্বার্থে ব্যবহৃত হতো।
যদিও রাশিয়ার পক্ষ থেকে এসবই ‘পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। তবে এপস্টেইন-সংশ্লিষ্ট লাখ লাখ পৃষ্ঠার এই নতুন নথিগুলো যে আগামী দিনে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও বড় কোনো ঝড় তুলবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

