মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘনঘটা। তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক চরম উত্তেজনাকর মোড়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পুরো অঞ্চলকে একটি ধ্বংসাত্মক মহাযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) মিসর সফর শেষে দেশে ফেরার পথে বিমানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এরদোয়ান তার এই গভীর উদ্বেগের কথা জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তুরস্ক কোনোভাবেই চায় না মধ্যপ্রাচ্য নতুন কোনো রক্তাক্ত সংঘাতের সাক্ষী হোক। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যদি সরাসরি কোনো সংলাপের পথ প্রশস্ত হয়, তবেই কেবল এই অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব।
ওমান আলোচনা: খাদের কিনারে কূটনীতি
আগামীকাল শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ওমানের মাসকাটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি নিম্ন পর্যায়ের পারমাণবিক আলোচনায় বসার কথা রয়েছে। তবে আলোচনার আগের দিন পর্যন্ত এজেন্ডা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পাহাড়সম দূরত্ব বজায় ছিল। প্রথমে এই বৈঠক তুরস্কের ইস্তাম্বুলে হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে ইরানের অনুরোধে তা মাসকাটে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এরদোয়ান বলেন, “উত্তেজনা যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেজন্য তুরস্ক সব দিক থেকে চেষ্টা করছে।” তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ওমানের এই আলোচনার পর যদি দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি বৈঠকে বসেন, তবে তা হবে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির জন্য এক বড় মাইলফলক।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও খামেনির উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি বজায় রেখেছে। সিএনএন ও এনবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সতর্ক করে বলেছেন যে, তেহরানের ‘অত্যন্ত উদ্বিগ্ন’ হওয়া উচিত। ট্রাম্পের এই কড়া বার্তার পর পুরো অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তবে ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ওই সব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এই ত্রিমুখী উত্তেজনার মাঝে তুরস্ক নিজেকে একজন ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
অমীমাংসিত এজেন্ডা ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
ওয়াশিংটন চায় ওমানের এই আলোচনায় কেবল পারমাণবিক ইস্যু নয়, বরং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত হোক। অন্যদিকে তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে কথা বলবে; তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো আপস করা হবে না।
এই অচলাবস্থার মধ্যে চীন ইরানের ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক অধিকার’কে সমর্থন দিয়েছে এবং যেকোনো ধরনের বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্ৎস বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চল সফর করছেন। তিনিও দোহায় এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের ‘আগ্রাসন’ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে দ্রুত আলোচনায় বসার তাগিদ দিয়েছেন।
তুরস্কের স্বার্থ ও অবস্থান
প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এই উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করছেন। তুরস্কের জন্য এই শান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ইরানের সঙ্গে তাদের বড় ধরনের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে আঙ্কারা এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ‘সেতুবন্ধন’ হওয়ার শেষ চেষ্টা চালাচ্ছে। আগামীকালের ওমান বৈঠকের ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ—শান্তি নাকি সংঘাত।

