ঘূর্ণিঝড় ‘ডিটওয়াহ’-এর প্রভাবে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কায় মানবিক ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারত বাধা সৃষ্টি করছে বলে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছে পাকিস্তান। মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই দাবি করা হয়েছে বলে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি নিশ্চিত করেছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর মঙ্গলবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, শ্রীলঙ্কায় মানবিক ত্রাণ পাঠানোর পাকিস্তানের প্রচেষ্টাকে ভারত বাধা দিচ্ছে। ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের কারণে দ্বীপরাষ্ট্রটিতে ইতোমধ্যে ৪০০-এরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) একটি পোস্টে উল্লেখ করেছে, “পাকিস্তান থেকে শ্রীলঙ্কার জনগণের জন্য মানবিক সহায়তা নিয়ে বিশেষ উড়োজাহাজটি ৬০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ভারতের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে।”
পোস্টে আরও বলা হয়, “৪৮ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর গত রাতে ভারত যে আংশিক উড্ডয়ন অনুমতি দিয়েছে, তা কার্যত বাস্তবসম্মত নয়। তারা মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য সীমিত সময় নির্ধারণ করেছিল এবং ফিরতি ফ্লাইটের জন্য কোনো প্রকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই ধরনের বাধা শ্রীলঙ্কার জনগণের জন্য অত্যন্ত জরুরি সহায়তা মিশনটিকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করেছে।”
তবে এই অভিযোগের বিপরীতে ইসলামাবাদে অবস্থিত একাধিক কূটনৈতিক সূত্র দেশটির সংবাদমাধ্যম ডন নিউজকে এর আগে জানিয়েছিল যে, শ্রীলঙ্কায় ত্রাণ পাঠানোর জন্য পাকিস্তান ভারতের আকাশসীমা ব্যবহারের প্রাথমিক অনুমতি লাভ করেছিল।
এদিকে, ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে শ্রীলঙ্কা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির প্রেসিডেন্ট অনুঢ়া কুমারা দিসানায়েকে ইতোমধ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, দেশটি বর্তমানে তার ইতিহাসের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরীয় সুনামির পর এটিই শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেখানে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চলের ওয়েলিমাডা শহরের এক কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী কর্মীরা ভূমিধসে চাপা পড়া লোকজনের সন্ধানে কাদামাটি খুঁড়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে যে নিহতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
অন্যদিকে, রাজধানী কলম্বোতে ধীরে ধীরে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা মঙ্গলবার জানিয়েছেন। যদিও স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতি বছর মৌসুমি বন্যার সাথে পরিচিত, তবুও এবারের দুর্যোগে শহরটিতে অপ্রত্যাশিত দ্রুত গতিতে পানি বৃদ্ধির ঘটনায় তারা বিস্মিত হয়েছেন।
স্থানীয় ডেলিভারি কর্মী দিনুশ সাঞ্জয়া এএফপিকে বলেন, “প্রতি বছর আমরা ছোট ছোট বন্যা দেখি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন।” স্থানীয় কর্মকর্তারা আরও জানান, যদিও দেশে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমেছে, তবুও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যাঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকায় এখনও ভূমিধসের সতর্কতা জারি রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার মতো একটি মানবিক সংকটের সময় দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে আকাশসীমা ব্যবহারের এই জটিলতা ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছে। এপ্রিল মাস থেকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, বিশেষ করে ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জনের প্রাণহানি এবং এর পরবর্তী চার দিনের সংঘাতের পর।
ভারত ও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই পরস্পরের আকাশসীমা সীমিত বা বন্ধ করে রেখেছে। গত অক্টোবরে ইসলামাবাদ ভারতের সব ধরনের বিমানের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধের নিষেধাজ্ঞা ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছিল। মানবিক সহায়তা বিতরণে এই ধরনের রাজনৈতিক বাধার ঘটনা আন্তর্জাতিক প্রথা ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী বলে আন্তর্জাতিক মহল মনে করছে।

