ফুটবল ও রাজনীতির চিরন্তন দ্বন্দ্বে এবার এক নজিরবিহীন অধ্যায় যুক্ত হলো। আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা-এর প্রেসিডেন্ট গিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ‘শত্রু তালিকায়’ অন্তর্ভুক্ত করেছে ইউক্রেন। দেশটির বিতর্কিত ওয়েবসাইট ‘মিরোৎভোরেৎস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং রাশিয়ার প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির অভিযোগে ফিফা প্রধানের নাম এই তালিকায় নথিভুক্ত করা হয়েছে।
মিরোৎভোরেৎস মূলত একটি ইউক্রেনীয় ওয়েবসাইট, যা দেশটির ভাষায় ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী’ হিসেবে পরিচিত হলেও বিশ্বজুড়ে এটি ‘হত্যা তালিকা’ বা ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ হিসেবে কুখ্যাত। যারা রাশিয়ার সামরিক অভিযানকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করেন কিংবা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী কাজ করেন, তাদের ব্যক্তিগত তথ্য এই সাইটে প্রকাশ করা হয়। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) ইনফান্তিনোর নাম সেখানে আসায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মহলে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
কেন এই তালিকায় ফিফা প্রধান?
মিরোৎভোরেৎসে গিয়ান্নি ইনফান্তিনো সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি রাশিয়ার প্রতি ‘পদ্ধতিগত সমর্থন’ দিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে এক ধরণের ‘মানবিক আগ্রাসন’ চালাচ্ছেন। ফিফা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো, তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রেমলিনের প্রোপাগান্ডা ছড়াতে সহায়তা করছেন।
তালিকায় বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে ২০১৯ সালের একটি ঘটনার কথা। সেই বছর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজে ইনফান্তিনোকে ‘অর্ডার অফ ফ্রেন্ডশিপ’ খেতাবে ভূষিত করেছিলেন। ইউক্রেনের দাবি, সেই সখ্যতা এখনও বজায় রেখেছেন ফিফা প্রধান, যা বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের জন্য অবমাননাকর।
একটি সাক্ষাৎকার এবং ইউক্রেনীয় ক্ষোভ
বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে সম্প্রতি দেওয়া ইনফান্তিনোর একটি সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ অভিযান শুরুর পর ফিফা ও উয়েফা একযোগে রুশ ফুটবল দলগুলোকে আন্তর্জাতিক আসর থেকে নিষিদ্ধ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ইনফান্তিনো দাবি করেন, এই নিষেধাজ্ঞা আসলে কোনো সুফল বয়ে আনেনি। বরং এটি ফুটবল বিশ্বে ঘৃণা ও হতাশা বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি এমনকি রাশিয়ার যুব দলগুলোকে পুনরায় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ফেরানোর পক্ষেও ইঙ্গিত দেন।
এই মন্তব্য প্রকাশের পর থেকেই ইউক্রেনীয় রাজনীতিবিদ ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেয়ি সিভিগা এক কড়া প্রতিক্রিয়ায় ইনফান্তিনোকে ‘নৈতিকভাবে আদর্শচ্যুত’ ব্যক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, যেখানে রাশিয়ার হামলায় শত শত ইউক্রেনীয় ক্রীড়াবিদ ও শিশু প্রাণ হারাচ্ছে, সেখানে রুশ ফুটবলারদের মাঠে ফেরানোর প্রস্তাব দেওয়া অপরাধের শামিল।
মিরোৎভোরেৎস ও পূর্বের নজির
এটিই প্রথম নয় যে কোনো বিশ্বনেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি মিরোৎভোরেৎসের তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। এর আগে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান, ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং এমনকি প্রয়াত মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জারের নামও এই তালিকায় উঠেছিল। তবে ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার প্রধানকে এই তালিকায় রাখা ফিফার জন্য এক বড় ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
রাশিয়া অবশ্য এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘খেলাধুলাকে রাজনীতিকরণের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, ফুটবলকে সবসময়ই রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা উচিত ছিল। তবে কিয়েভের পক্ষ থেকে এই ওয়েবসাইটের কার্যক্রমকে তাদের ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সূচি যখন দুয়ারে, তখন ফিফা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ বিশ্ব ফুটবলের রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও স্পষ্ট করে তুলল।

