দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে বড় ধরণের ধাক্কা খেল শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী–ঝিনাইগাতী) আসনের নির্বাচনী আমেজ। এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত বৈধ প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো আসনের নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বুধবার সকালে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ২টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নুরুজ্জামান বাদল। তার মৃত্যুর খবরে জেলা জামায়াতসহ স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শেরপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, নুরুজ্জামান বাদল কেবল একজন প্রার্থী ছিলেন না, বরং এলাকার মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার এই প্রস্থান নির্বাচনী লড়াইয়ে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করল।
মধ্যরাতের ট্র্যাজেডি: যেভাবে বিদায় নিলেন নুরুজ্জামান বাদল
পারিবারিক ও স্থানীয় দলীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন নুরুজ্জামান বাদল। মুহূর্তেই তার অবস্থার অবনতি হতে শুরু করলে পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।
কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যরকম। অ্যাম্বুলেন্সে করে ময়মনসিংহের স্বদেশ হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাত ২টার দিকে শহরের প্রবেশমুখ ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। সেখানেই কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান এই প্রবীণ নেতা।
আইনি মারপ্যাঁচ: কেন স্থগিত হলো নির্বাচন?
বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর ১৭(১) উপধারা অনুযায়ী, যদি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হওয়ার পর এবং ভোটগ্রহণের আগে কোনো ‘বৈধ প্রার্থী’ মৃত্যুবরণ করেন, তবে সংশ্লিষ্ট আসনের নির্বাচনী কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল বা স্থগিত করার বিধান রয়েছে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, নুরুজ্জামান বাদল যেহেতু এই আসনে একজন বৈধ ও চূড়ান্ত প্রার্থী ছিলেন, তাই আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে সেখানে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ সম্ভব নয়। রিটার্নিং কর্মকর্তা ইতোমধ্যে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছেন। পরবর্তীতে কমিশনের পক্ষ থেকে এই আসনে নতুন করে মনোনয়নপত্র জমা ও ভোটগ্রহণের তারিখ সম্বলিত ‘নতুন তফসিল’ ঘোষণা করা হবে।
ভোটারদের অপেক্ষা ও পরবর্তী ধাপ
শেরপুর-৩ আসনের এই স্থগিতাদেশ কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি স্থানীয় রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশেও বড় পরিবর্তন আনবে। ইসি জানিয়েছে, নতুন তফসিল অনুযায়ী মৃত প্রার্থীর জায়গায় তার দল (জামায়াতে ইসলামী) নতুন কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ পাবে। তবে যারা ইতোমধ্যে বৈধ প্রার্থী হিসেবে তালিকায় আছেন, তাদের নতুন করে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে না।
বর্তমানে পুরো জেলায় শোকের আবহ বিরাজ করছে। শেরপুরের দুই দফা জানাজা শেষে মরহুমের দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে, সাধারণ ভোটাররা এখন কমিশনের পরবর্তী নির্দেশের দিকে তাকিয়ে আছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের উৎসবের মাঝে শেরপুর-৩ আসনের মানুষের জন্য এখন কেবলই দীর্ঘ অপেক্ষার পালা।

