আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের উন্নয়ন দর্শন ও রাষ্ট্র সংস্কারের বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। বুধবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের আইএবি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর) এই ইশতেহার ঘোষণা করেন। ‘জনপ্রত্যাশার বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে ঘোষিত এই ইশতেহারে ২৮টি খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
চরমোনাই পীর তার বক্তব্যে দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং সুশাসনের অভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি বর্তমানে অত্যন্ত নড়বড়ে, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে প্রযুক্তি পর্যন্ত সবকিছুই আমদানিনির্ভর। এই পরনির্ভরশীলতা দূর করে একটি আত্মনির্ভরশীল ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলাই তাদের ইশতেহারের মূল লক্ষ্য। ইশতেহারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি নির্মূল ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ
ইসলামী আন্দোলনের ইশতেহারের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অর্থনৈতিক সংস্কার। মুফতি রেজাউল করীম বলেন, “আমাদের অর্থনীতি এখন মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে বন্দী। আমরা ক্ষমতায় গেলে ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের দুর্নীতি ও টাকা পাচার পুরোপুরি বন্ধ করব।” ইশতেহারে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ পেশাদারিত্ব আনার কথা বলা হয়েছে, যাতে কঠিন শর্তে ঋণ নিয়ে দেশ কোনো ঋণের জালে না পড়ে।
দলটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা ক্ষমতায় গেলে রপ্তানি খাতকে কেবল শ্রমনির্ভর না রেখে প্রযুক্তি-কেন্দ্রিক ও বহুমুখী করবে। এছাড়া বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে দক্ষতামুখী করার মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও স্থিতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘বিনিয়োগের স্বর্গ’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নও দেখিয়েছে দলটি।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা
ইশতেহারে নৈতিকতা সমৃদ্ধ, কর্মমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন মনে করে, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে শ্রমবাজারের কোনো সমন্বয় নেই, যার ফলে শিক্ষিত বেকারত্বের হার বাড়ছে। এই সমস্যা সমাধানে তারা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সমন্বিত রূপরেখা পেশ করেছে। এছাড়া যুবকদের জন্য ‘শোভন কর্মসংস্থান’ এবং প্রবাসীদের জন্য বিশেষ কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাত নিয়ে দলটির পরিকল্পনায় রয়েছে সর্বজনীন উন্নত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা। বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ‘সিনিয় সিটিজেন ম্যানেজমেন্ট’ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসরণের বিষয়গুলো ইশতেহারে জায়গা পেয়েছে। কৃষির উন্নয়ন এবং উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বিপণন নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক সংহতি ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
সংবাদ সম্মেলনে চরমোনাই পীর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে ইসলামী আদর্শ ও ঐক্যের অভাব রয়েছে। এই কারণেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সেই জোট থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব শক্তিতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তিনি দাবি করেন, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে এবং রাষ্ট্র সংস্কারে ইসলামী আন্দোলন আপসহীন।
দলটি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে বিশ্বমানের করতে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও দূষণমুক্ত করতে তাদের ২৮ দফার মধ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। মুফতি রেজাউল করীম বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে আইনের শাসনের চেয়ে ন্যায়ের শাসন বেশি প্রতিষ্ঠিত হবে।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বেজে ওঠার এই সময়ে ইসলামী আন্দোলনের এই বিস্তারিত ইশতেহার ভোটারদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে জামায়াত ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ভিড়ে চরমোনাই পীরের এই ‘তৃতীয় ধারা’র উন্নয়ন পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের মাঝে কতটা প্রভাব ফেলে, তা দেখার জন্য এখন ১২ ফেব্রুয়ারির অপেক্ষায় পুরো দেশ।

