জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে নির্বাচনী মাঠের উত্তাপ রাজপথ ছাড়িয়ে এখন নির্বাচন পরিচালনার কাঠামোগত স্বচ্ছতা নিয়ে তর্কে রূপ নিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা বা প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজিব ভুঁইয়া এই দাবি করেন। তার মতে, সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই করে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, যা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে প্রধান অন্তরায়।
আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, প্রিজাইডিং অফিসার হওয়ার যোগ্য কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহের জন্য রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এ ধরনের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক তথ্য সংগ্রহ করার কথা নয়। অথচ মাঠ পর্যায়ে মিড-লেভেল এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সহায়তায় অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই ‘স্ক্রিনিং’ বা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ বলেন, “আমরা আগে দেখেছি চাকরি পাওয়া বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বড় হয়ে দাঁড়াত। কিন্তু এখন আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, ভোটগ্রহণের মতো পবিত্র দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক মতাদর্শকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হচ্ছে। যখন একটি নির্দিষ্ট আদর্শের মানুষদের প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে বসানো হবে, তখন নির্বাচন যে কারচুপির দিকে যাচ্ছে তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।”
তিনি আরও দাবি করেন, এই প্রক্রিয়ার পেছনে একটি সুক্ষ্ম ‘নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং’ করার পরিকল্পনা কাজ করছে। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়ে ভোটের ফলাফল নিজেদের পক্ষে নেওয়ার একটি মানসিকতা প্রশাসনের একাংশের মধ্যে কাজ করছে বলে তিনি মনে করেন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা নিয়েও এদিন কড়া সমালোচনা করেন এই তরুণ নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন বর্তমানে একটি ‘গভীর খাদের’ মতো আচরণ করছে, যেখানে বিরোধীদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ বা চিঠি গেলে তার আর কোনো হদিস পাওয়া যায় না। অথচ কোনো নির্দিষ্ট দলের বিপক্ষে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হলে তা অতি দ্রুত কার্যকর করা হচ্ছে।
আসিফ মাহমুদের ভাষ্যমতে, মাঠ পর্যায়ে যেসব সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছেন, তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে ‘পছন্দের’ কর্মকর্তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গা থেকে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, যারা এই ধরনের অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না হলে ভোটগ্রহণের আগেই এই নির্বাচন জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসিফ মাহমুদের এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে বড় ধরনের সংকটে ফেলবে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হলে ভোটের টার্নআউট বা উপস্থিতিও কমে যেতে পারে। বিশেষ করে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য যেখানে সকল পক্ষের সমান সুযোগ (Level Playing Field) নিশ্চিত করার কথা, সেখানে প্রিজাইডিং অফিসারদের নিয়ে এ ধরনের বিতর্ক শুভলক্ষণ নয়।
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়ে যদি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে বিজয়ী করার চেষ্টা করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ তা মেনে নেবে না। আমরা চাই প্রতিটি কেন্দ্রে এমন অফিসাররা দায়িত্ব পালন করুন যাদের কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ নেই এবং যারা কেবল আইনের প্রতি দায়বদ্ধ।”
নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এ ধরনের অভিযোগ রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

