ভারতের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কেন্দ্রীয় বাজেট আজ সংসদে পেশ করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তবে এই বাজেটে একটি বিষয় আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে—বিদেশে ভারতের কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ইরানের ‘চাবাহার’ বন্দরের জন্য এবার কোনো বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়নি। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারতের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে ইরানের সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত এই বন্দরটির উন্নয়নে ভারত নিয়মিতভাবে বছরে অন্তত ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ দিয়ে আসছিল। কিন্তু এবারের বাজেটে সেই ধারা ভেঙে কোনো বরাদ্দ না রাখায় প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে অথবা মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই প্রকল্প নিয়ে পিছু হটছে ভারত?
চাবাহার বন্দরটি ভারতের জন্য কেবল একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্র নয়, এটি পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দরের পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে বিবেচিত। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় তৈরি গওয়াদর বন্দরের ঠিক বিপরীত মেরুতে ওমান উপসাগরের মোহনায় চাবাহারের অবস্থান। এটি ভারতকে পাকিস্তানকে এড়িয়ে সরাসরি আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের এক বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছিল।
এই প্রকল্পের ইতিহাস দুই দশকের পুরনো। ২০০২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ীর আমলে এই বন্দরের পরিকল্পনা শুরু হয়। এরপর ২০০৩ সালে ইরানি প্রেসিডেন্ট সাইয়েদ মোহাম্মদ খাতামির ভারত সফরের সময় চাবাহারকে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বিশেষ করে পাকিস্তানের স্থলপথ ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় ভারতের জন্য এটি ছিল আশীর্বাদস্বরূপ।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৬ সালে তালেবান যখন প্রথমবার ক্ষমতা দখল করে, তখন থেকেই ভারত ও ইরান তাদের স্বার্থ রক্ষায় এই বিকল্প রুট নিয়ে কাজ শুরু করে। গত দুই দশকে এই বন্দর দিয়ে ভারত হাজার হাজার টন গম ও মানবিক সহায়তা আফগানিস্তানে পাঠিয়েছে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধংদেহী মনোভাব ভারতের জন্য চাবাহারকে এক ‘তপ্ত কয়লা’য় পরিণত করেছে।
বাজেটে বরাদ্দ না থাকার অর্থ কি প্রকল্পের সমাপ্তি? ভারতীয় কূটনীতিকদের একাংশ বলছেন, হয়তো সরাসরি বাজেটে অর্থ বরাদ্দ না রেখে ভিন্ন কোনো তহবিল থেকে এই কাজ চালানো হবে। তবে সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। একদিকে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ি, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান—এই দুইয়ের চাপে পড়ে ভারত তার বিদেশ নীতিতে বড় কোনো রদবদল আনছে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন।
চাবাহার প্রকল্পের ভবিষ্যৎ ঝুলে থাকলে তা ভারতের মধ্য এশিয়া নীতিতে বড় ধাক্কা হতে পারে। অন্যদিকে, গওয়াদর বন্দরে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ভারতের জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করবে। আজকের বাজেট অধিবেশনে অনেক জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ঘোষণা এলেও, চাবাহারের এই ‘শূন্য বরাদ্দ’ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের জন্ম দিল।

