ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে। মার্কিন সামরিক তৎপরতা ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত হুমকির জবাবে আজ চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর কোনো ধরনের হামলা চালায়, তবে তা আর কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে—পরিণত হবে এক ভয়াবহ ‘আঞ্চলিক যুদ্ধে’।
রোববার তেহরানে ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রাক্কালে এক জনসমাবেশে খামেনি বলেন, মার্কিন রণতরী কিংবা বোমারু বিমানের হুঙ্কারে ইরান বিচলিত নয়। মার্কিন প্রশাসন যে সামরিক উপস্থিতির দাপট দেখাচ্ছে, তাকে ‘মনস্তাত্ত্বিক খেলা’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, “এই ব্যক্তি (ট্রাম্প) প্রায়ই বলেন যে তিনি সাগরে বড় জাহাজ পাঠিয়েছেন। এসব দেখিয়ে ইরানি জাতিকে ভয় দেখানো যাবে না।”
গত জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বোমা হামলার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। ট্রাম্প প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইরান যদি নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে সই না করে কিংবা দেশের ভেতরে চলমান বিক্ষোভ দমনে রক্তপাত বন্ধ না করে, তবে আরও বড় সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি ডেস্ট্রয়ার ও একটি শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন রয়েছে, যাকে ট্রাম্প ‘বিউটিফুল আর্মাডা’ বা চমৎকার রণতরী বহর বলে বর্ণনা করেছেন।
খামেনি তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, ইরান নিজে থেকে কোনো সংঘাত শুরু করবে না। তবে কেউ যদি আগ্রাসন চালায়, তবে তার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমেরিকানদের জানা উচিত, তারা যদি এবার যুদ্ধ শুরু করে, তবে এটি একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ হবে। যার প্রভাব থেকে এই অঞ্চলের কোনো দেশই মুক্ত থাকতে পারবে না।”
এদিকে উত্তেজনার পারদ চড়লেও পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক সমাধানের ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। তেহরানের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা একটি ‘ন্যায্য’ আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তবে সেই আলোচনায় ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বা মিসাইল প্রোগ্রাম নিয়ে কোনো আপস করা হবে না—এমন শর্তও জুড়ে দিয়েছে দেশটি। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এখন আলোচনার বিষয়ে ‘যথেষ্ট গুরুত্ব’ দিচ্ছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এখন টালমাটাল অবস্থা। অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে গত বছরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন শাসনব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খামেনি এই বিক্ষোভকে একটি ‘অভ্যুত্থানসদৃশ ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং এর পেছনে বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।
উল্লেখ্য, এবারের বিক্ষোভে প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে সরকার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে ব্যাপক তফাত দেখা গেছে। সরকারি হিসেবে ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হলেও, মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA) বলছে এই সংখ্যা ৬ হাজার ৭১৩ ছাড়িয়ে গেছে। ক্রমবর্ধমান এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের মধ্যেই মার্কিন সামরিক চাপ তেহরানকে এক কঠিন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির এই ‘আঞ্চলিক যুদ্ধের’ হুমকি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন মিত্রদের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করা। যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পুরো অঞ্চলের তেলের বাজার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে—এমন বার্তাই আজ পৌঁছে দিলেন ৮৬ বছর বয়সী এই শীর্ষ নেতা।

