বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পথে বর্তমানে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগের ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, দলটির এই নেতিবাচক মনোভাব কেবল নির্বাচনী পরিবেশই নষ্ট করছে না, বরং সামগ্রিকভাবে দেশের শান্তি ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) রাজধানীর বিএফডিসিতে ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ আয়োজিত এক ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘আসন্ন গণভোট ও সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলে প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান হবে’ শীর্ষক এই বিতর্কে তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রভাব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ আক্ষেপ করে বলেন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীন ভূখণ্ড আমরা পেয়েছি, তার প্রকৃত সুফল আজও সাধারণ মানুষের দ্বারে পৌঁছায়নি। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকেই দেশের গণতন্ত্র বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, যার ফলে এক পর্যায়ে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার কলঙ্কিত অধ্যায় শুরু হয়। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, ক্ষমতার মোহে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলেন।
নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই প্রবীণ শিক্ষাবিদ দাবি করেন, বর্তমানে নির্বাচনের পরিবেশ বিঘ্নিত করার পেছনে ‘পতিত স্বৈরাচার’ এবং একটি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে। তিনি ভারতকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বাংলাদেশে ক্ষমতার যে পরিবর্তন এসেছে এবং সামনে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা হয়তো তারা মেনে নিতে পারছে না। আর সে কারণেই বিদেশি দূতাবাসগুলোর কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে দেশে একটি কৃত্রিম অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সাধারণ কোনো নির্বাচন নয়। এটি মূলত ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের লড়াই। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার এবং হারানো ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের এক মহা-সুযোগ এই নির্বাচন। তিনি সতর্ক করে বলেন, পালিয়ে যাওয়া গোষ্ঠী এবং তাদের দোসররা নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে এখনো নানামুখী ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।
কিরণ আরও উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনী প্রচারণার নামে একে অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা এবং আক্রোশ ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এই প্রতিহিংসার আগুন কেবল রাজনীতি নয়, পুরো সমাজকেই গ্রাস করবে। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এখন থেকেই সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যারাই নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের মূল কাজ হওয়া উচিত গত দেড় দশকের ক্ষতগুলো সারিয়ে তোলা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
ছায়া সংসদের এই গ্র্যান্ড ফাইনালে বিতার্কিকদের যুক্তি-তর্ক ছিল দেখার মতো। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতায় স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে এবং রানার আপ হয় ইডেন মহিলা কলেজ। প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান পায় তেজগাঁও কলেজ। শ্রেষ্ঠ বক্তার পুরস্কার জিতে নেন ইডেন কলেজের দলনেতা মাসনুন নাবিলাহ আলম। বিজয়ী ও বিজিত দলগুলোর হাতে ট্রফি, ক্রেস্ট এবং মোটা অঙ্কের অর্থ পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর এই বক্তব্য এবং ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির এই আয়োজন এমন এক সময়ে হলো যখন দেশ একটি বড় ধরণের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন সম্ভব হলেও, প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এবং জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

