অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় আবারও ফিরে এসেছে যুদ্ধের সেই চেনা বিভীষিকা। দীর্ঘ চার মাসের নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যত ধূলিসাৎ করে দিয়ে শনিবার ভোররাত থেকে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। উত্তর থেকে দক্ষিণ—গাজার প্রতিটি প্রান্ত আজ কামানের গোলা আর বিমান হামলায় কেঁপে উঠেছে। দুপুর পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ইসরায়েলের এই নতুন দফার আগ্রাসনে অন্তত ১৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
এদিনের সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি চালানো হয় গাজা সিটির শেখ রেদওয়ান এলাকায়। সেখানে ফিলিস্তিনি পুলিশ সদরদপ্তরকে লক্ষ্য করে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। ধুলোর চাদরে ঢেকে যাওয়া সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অসংখ্য মানুষ, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন শত শত নিরপরাধ মানুষ।
ভোরের আলো ফোটার আগেই মধ্য গাজায় চালানো আরেকটি অভিযানে পাঁচজন প্রাণ হারান। এর কিছুক্ষণ পরেই দক্ষিণ গাজার আল-মাওয়াসি এলাকায় ইসরায়েলি গোলন্দাজ বাহিনীর হামলায় আরও সাতজন নিহত হন। উল্লেখ্য, আল-মাওয়াসিকে এর আগে ইসরায়েল নিজেই ‘নিরাপদ অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ফলে সেখানে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত মানুষেরা এই আচমকা হামলায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে অভিহিত করেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে। গত বছরের অক্টোবরে স্বাক্ষরিত সেই নড়বড়ে চুক্তিটি শুরু থেকেই ইসরায়েলি সেনাদের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে হুমকির মুখে ছিল। হামাসের দাবি, ইসরায়েল শান্তি চায় না, বরং তারা গাজাকে জনশূন্য করার নীল নকশা বাস্তবায়ন করছে।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের পরিসংখ্যান বলছে, তথাকথিত এই যুদ্ধবিরতি চলাকালীন সময়েও ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে পাঁচশর বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। আলজাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ মধ্য গাজা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, আজকের হামলার ধরন বিগত কয়েক সপ্তাহের চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পিত ও বিধ্বংসী। সকাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও সরকারি স্থাপনা টার্গেট করা হচ্ছে, যা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস অত্যন্ত করুণ। এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। আন্তর্জাতিক মহলের বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান সত্ত্বেয় দখলদার বাহিনীর এই অব্যাহত সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শনিবারের এই সাঁড়াশি অভিযান কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক তৎপরতা নয়, বরং বড় ধরণের কোনো সংঘাতের পূর্বাভাস। হাসপাতালের করিডোর থেকে শুরু করে ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ির আঙিনা—সবখানেই এখন স্বজন হারানোর আর্তনাদ। ত্রাণ ও চিকিৎসার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গাজার আকাশে উড়তে থাকা যুদ্ধবিমানের গর্জন যেন ঘোষণা করছে, শান্তির পথ এখনো অনেক দূরে।

