ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে একটি বহুতল আবাসিক ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার বিকেলে উপকূলীয় এই শহরের মোয়াল্লেম বুলেভার্ড এলাকায় অবস্থিত একটি আটতলা ভবনে এই দুর্ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবনটির দুটি তলা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে এবং আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে ভবনের সামনের অংশ ধসে পড়ে ভেতরের কাঠামো বেরিয়ে এসেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে কোনো বাসিন্দা আটকা পড়ে আছেন কি না, তা নিশ্চিতে ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রাণহানির কোনো খবর না পাওয়া গেলেও বেশ কয়েকজন আহত ব্যক্তিকে স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
বিস্ফোরণের পর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর এক শীর্ষ কমান্ডারকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি এই দাবিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানোর তথ্য কেবলই অপপ্রচার।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত কয়েক দিন ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে আসছেন। ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বিক্ষোভ দমনের অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও সৈন্য মোতায়েন করেছে। এই উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণের ঘটনাটি জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একটি বিশেষজ্ঞ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পাশাপাশি গ্যাস লাইনের ত্রুটি বা অন্য কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিস্ফোরণের ফলে ওই ভবনের পাশে পার্ক করা বেশ কিছু যানবাহন এবং নিকটবর্তী দোকানপাটও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হরমুজগান প্রদেশের সংকট ব্যবস্থাপনা দপ্তরের মহাপরিচালক মেহরদাদ হাসানজাদেহ জানিয়েছেন, “আহতদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ভবনটি বর্তমানে বসবাসের অনুপযুক্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।” তেহরানসহ ইরানের বড় শহরগুলোতে যখন আঞ্চলিক যুদ্ধের মেঘ জমছে, তখন এই বন্দরনগরীতে এমন বিস্ফোরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ-ঘাঁটির নিকটবর্তী এলাকায় এই ঘটনা ঘটায় আন্তর্জাতিক মহলের নজরও এখন বন্দর আব্বাসের দিকে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী বা বিদেশি শক্তি এই ঘটনার দায় স্বীকার করেনি। ইরানের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করছে, যেখানে উদ্ধারকর্মীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিস্ফোরণ যদি নিছক দুর্ঘটনাও হয়, তবুও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। বিশেষ করে মার্কিন নৌবাহিনীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির মধ্যে উপকূলীয় শহরে এমন ঘটনা ইরান সরকারকে বাড়তি চাপে রাখবে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ না করা পর্যন্ত জল্পনা-কল্পনা থামার লক্ষণ নেই।

