উপমহাদেশের ক্রিকেটে মাঠের লড়াই যতটা না উত্তাপ ছড়ায়, তার চেয়েও বেশি উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়ছে মাঠের বাইরের কূটনীতিতে। ভারত ও পাকিস্তানের চিরবৈরী সম্পর্কের জেরে দীর্ঘকাল ধরে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ থাকাটা ক্রিকেট বিশ্বের জন্য এক পরিচিত দৃশ্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই রাজনৈতিক বৈরিতার ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেট সম্পর্কের ওপরও। নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কে দেখা দিয়েছে বড় ধরণের টানাপোড়েন।
নিরাপত্তা শঙ্কার অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। এর পরপরই পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ঘোষণা দেয় যে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে তারা ভারত সফরে যাবে না। একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে পাকিস্তানও। ক্রিকেটের এই অস্থির সময়ে এবার মুখ খুলেছেন আফগানিস্তানের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক রশিদ খান।
বিশ্বের অন্যতম সেরা এই লেগ স্পিনার মনে করেন, ক্রিকেটের সৌন্দর্য বজায় রাখতে একে রাজনীতির উর্ধ্বে রাখা জরুরি। মাঠের লড়াইয়ে রাজনৈতিক প্রভাব পড়াটা খেলার মূল চেতনার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। রশিদ খানের মতে, খেলাধুলা হওয়া উচিত দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির মাধ্যম, বিচ্ছেদের নয়।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে রশিদ খান বলেন, “আমার মনে হয় প্রকৃত স্পোর্টিং মানসিকতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। আমরা প্রায়ই শুনে থাকি যে ক্রিকেট ও রাজনীতি মেশানো উচিত নয়। যদি সত্যিই তা না মেশানোর কথা থাকে, তবে আমাদের সেই নীতিতেই অটল থাকা উচিত। যদিও এসব বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছেন, তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি খেলাধুলাকে তার আপন গতিতে চলতে দেওয়া উচিত।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, খেলাধুলাই একমাত্র মাধ্যম যা বিভিন্ন দেশের মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। রশিদের ভাষায়, “আমরা সবসময় বলি খেলাধুলার মাধ্যমে একতা বাড়ে, বিশ্বের নানা প্রান্তের দেশগুলো এক জায়গায় আসে। এটাই তো ক্রিকেটের আসল মজা। আফগানিস্তানের কথাই ধরুন না, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে খেলাধুলা যা করে দেখিয়েছে, অন্য কোনো কিছু তা করতে পারত না।”
রশিদ খানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন এশিয়ান ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরণের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশের মতো দুটি ক্রিকেট পাগল দেশের মধ্যেকার এই দূরত্ব বিশ্ব ক্রিকেটের বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, মুস্তাফিজের আইপিএল থেকে বাদ পড়া এবং বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বয়কটের সিদ্ধান্ত ক্রিকেটের বৈশ্বিক ইভেন্টগুলোর জৌলুস কমিয়ে দিতে পারে।
রাজনীতির বেড়াজালে ক্রিকেট বন্দি হয়ে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ দর্শকরা। ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ হিসেবে রশিদ খান সেই আবেগটিই তুলে ধরতে চেয়েছেন। তার মতে, খেলোয়াড়রা মাঠে নামেন বিনোদন দিতে এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে, সেখানে ভূ-রাজনীতির অনুপ্রবেশ খেলার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে দেয়।
আফগান অধিনায়কের এই সাহসী ও বাস্তবসম্মত মন্তব্য এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অনেকেই তার সাথে একমত পোষণ করে বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধের খেসারত যেন কোনোভাবেই ক্রিকেটার বা ক্রিকেট প্রেমীদের দিতে না হয়। ক্রিকেটের স্বার্থে আইসিসি এবং এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের উচিত দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট নিরসন করা।
আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে রশিদ খানের এই বার্তা ক্রিকেট বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলবে কিনা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একজন পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, মাঠের বাইরের লড়াই কখনো মাঠের ভেতরকার বন্ধুত্ব আর সৌহার্দ্যকে ছাপিয়ে যেতে পারে না।

