ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক বিরল ও সম্মানজনক নজির স্থাপন করল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে আজ বুধবার ভারতের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে (লোকসভা ও রাজ্যসভা) আনুষ্ঠানিকভাবে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেই ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ভাষণের পরপরই বাংলাদেশের এই মহীয়সী নেত্রীর প্রতি মরণোত্তর শ্রদ্ধা জানায় ভারতীয় সংসদ।
গত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তার মৃত্যুতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, ভারত তাকে ‘অপরণীয় ক্ষতি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। আজকের অধিবেশনে লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্যরা দাঁড়িয়ে দুই মিনিট নীরবতা পালন করে মরহুম নেত্রীর বিদেহী আত্মার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআই জানিয়েছে, বাজেট অধিবেশনের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম দিনে সাবেক সংসদ সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করা হয়। তালিকায় ভারতের সাবেক এমপি এল গনেশন ও সুরেশ কালমাদির পাশাপাশি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাম বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভারতের পার্লামেন্টে কোনো বিদেশি নেতার প্রতি এমন শোকপ্রস্তাব উত্থাপনকে দুই দেশের গভীর সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরপরই দিল্লির পক্ষ থেকে যে বিশেষ কূটনৈতিক তত্পরতা দেখা গেছে, তা ছিল চোখে পড়ার মতো। গত ৩১ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রাহ্মণিয়াম জয়শঙ্কর বিশেষ বিমানে ঢাকা সফর করেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে দেন। শোকবার্তায় মোদি খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন ও সংকল্পবদ্ধ’ নেত্রী হিসেবে অভিহিত করেন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে তার অবদানের কথা স্মরণ করেন।
উল্লেখ্য, আজ থেকে শুরু হওয়া ভারতের বাজেট অধিবেশন আগামী ২ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। ৬৫ দিনের এই দীর্ঘ অধিবেশনে মোট ৩০টি কার্যদিবস থাকবে। তবে প্রথম দিনের শুরুতেই প্রতিবেশি দেশের একজন নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে ভারত তার প্রতিবেশি নীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও একবার স্পষ্ট করল।
রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দিল্লির এই ‘কৌশলগত সংযোগ’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের পর এবার পার্লামেন্টে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রতি ভারতের এই সম্মান প্রদর্শন দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংও দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনে গিয়ে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেছেন। তিনি লিখেছেন, “ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে খালেদা জিয়ার ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।” দিল্লির এই সম্মানজনক পদক্ষেপের পর বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।

