মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির পারদ আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের আকাশসীমা আংশিক বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ ও এর আশপাশের জলসীমায় বড় ধরনের ‘লাইভ-ফায়ার’ বা সরাসরি গুলি ছোড়ার সামরিক মহড়া শুরু করেছে তেহরান। মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের এই পাল্টা শক্তি প্রদর্শন ওই অঞ্চলে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত করছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ একটি জরুরি ‘নোটিশ টু এয়ারম্যান’ (নোটেম) জারি করেছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২৭ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর ওপর দিয়ে সব ধরনের বিমান চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত এলাকাকে ‘বিপজ্জনক জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সতর্কবার্তায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এই উচ্চতার নিচে কোনো উড্ডয়ন দেখা গেলে সেটিকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ইরানের এই সামরিক পদক্ষেপ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্ট্রাল কমান্ড’ (সেন্টকম) কর্তৃক ঘোষিত একটি বহুদলীয় আকাশ মহড়ার প্রতিক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত ২৬ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশিত সেই ‘আর্মাডা’ বা নৌবহর মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর পর থেকেই ইরান তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। মার্কিন রণতরী বহরের আগমনের পরপরই সেন্টকম তাদের আকাশশক্তির মহড়া ঘোষণা করলে তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা লাইভ-ফায়ার মহড়ার সিদ্ধান্ত নেয় তেহরান।
উল্লেখ্য, ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের পর থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। গত ডিসেম্বরের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক অভিযানের হুমকির প্রেক্ষিতে ইরান এখন ‘পুরোদমে প্রস্তুত’ থাকার বার্তা দিচ্ছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, “শত্রুপক্ষের যেকোনো উসকানি বা আগ্রাসনের মুখে ইরান দ্রুত এবং কঠোরতম প্রতিক্রিয়া জানাতে দ্বিধা করবে না।”
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অপরিশোধিত তেল পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট। প্রতিদিন বিশ্ববাজারের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যায়। এখানে যেকোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা মহড়া বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে এই উত্তেজনার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
সূত্র মারফত জানা গেছে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের নৌ ও বিমান শাখা এই যৌথ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। সেখানে তারা উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করছে। অন্যদিকে, পেন্টাগন ও সেন্টকম পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতি বজায় রাখতেই তাদের উপস্থিতি জোরদার করেছে। তবে তেহরানের দাবি, মার্কিন ‘আর্মাডা’র উপস্থিতিই এ অঞ্চলের প্রধান অস্থিরতার কারণ।

