ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক নক্ষত্রের পতন ঘটল। বুধবার সকালে পুনে জেলার বারামতি বিমানবন্দরের কাছে এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী এবং ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) প্রধান অজিত পাওয়ার (৬৬) নিহত হয়েছেন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় অজিত পাওয়ারসহ বিমানে থাকা মোট ৫ আরোহীর সবাই প্রাণ হারিয়েছেন বলে প্রাথমিক তথ্যে নিশ্চিত করেছে ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (ডিজিসিএ)।
আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি মহারাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য জেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রচারণার জন্য আজ বারামতিতে চারটি জনসভায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল এই প্রভাবশালী নেতার। সেই লক্ষ্যেই বুধবার সকাল ৮টা ১০ মিনিটে মুম্বাই থেকে একটি চার্টার্ড বিমানে (লিয়ারজেট ৪৫) করে রওনা হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহূর্তে সব স্বপ্ন বিলীন হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও রাডার তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট নাগাদ বারামতি বিমানবন্দরের রানওয়েতে অবতরণের চেষ্টা করার সময় ঘন কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা অত্যন্ত কম ছিল। পাইলট প্রথম দফায় অবতরণে ব্যর্থ হয়ে পুনরায় চক্কর কাটেন। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে (এটিসি) পাঠানো শেষ বার্তায় পাইলট জানিয়েছিলেন যে রানওয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। এর কিছুক্ষণ পরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমানটি বিমানবন্দরের কাছে একটি পাহাড়ি এলাকায় আছড়ে পড়ে এবং সাথে সাথেই তাতে বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে আগুন ধরে যায়।
দুর্ঘটনায় অজিত পাওয়ারের সাথে বিমানে থাকা তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা (পিএসও) বিদিপ যাদব, একজন পরিচারিকা এবং দুই পাইলট—ক্যাপ্টেন সুমিত কাপুর ও ক্যাপ্টেন শম্ভাবী পাঠক নিহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা গেছে, বিধ্বস্ত বিমানটির ধ্বংসাবশেষ পুরোপুরি ভস্মীভূত হয়ে গেছে এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশের দিকে উঠছে।
অজিত পাওয়ারের এই অকাল মৃত্যুতে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক শারদ পাওয়ারের ভাতিজা এবং রাজ্যের রাজনীতিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ছয়বার উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অজিত পাওয়ারকে তার কর্মদক্ষতা ও তৃণমূলের সাথে গভীর সংযোগের কারণে সমর্থকরা ভালোবেসে ‘অজিত দাদা’ বলে ডাকতেন।
মহারাষ্ট্র সরকার এই ঘটনায় তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে এবং বুধবার পুরো রাজ্যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, “আমি আমার এক শক্তিশালী ও উদার বন্ধুকে হারালাম। মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এই শূন্যতা অপূরণীয়।” ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও এই ঘটনায় গভীর শোক ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
ইতিমধ্যেই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি (এএআইবি) গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিনিধিরা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ব্ল্যাক বক্স ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন। প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে, যান্ত্রিক ত্রুটির পাশাপাশি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াই এই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকালে অজিত পাওয়ারের নিজ গ্রাম কাটেওয়াড়িতে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। বর্তমানে তার মরদেহ বারামতির স্থানীয় হাসপাতালে রাখা হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার শোকাতুর সমর্থক ভিড় জমিয়েছেন। ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের এই উত্তরাধিকারীর বিদায় কেবল মহারাষ্ট্র নয়, সমগ্র ভারতের রাজনীতিতেই এক বড় ধাক্কা।

