২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নিয়ে নাটকীয়তা যেন থামছেই না। টুর্নামেন্ট শুরুর প্রাক্কালে দাঁড়িয়েও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এখনো তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি। বিশেষ করে, বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে পিসিবি যে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল, তা এখন এক বড় কূটনৈতিক ও ক্রীড়া সংকটে রূপ নিয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই সংবেদনশীল যে, পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি খোদ দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি সপ্তাহের শেষ দিকেই ইসলামাবাদ থেকে সবুজ সংকেত আসতে পারে। তবে পর্দার আড়ালে আলোচনা চলছে যে, পাকিস্তান সরাসরি টুর্নামেন্ট বয়কট না করলেও ‘প্রতীকী প্রতিবাদ’ হিসেবে ভারতের বিপক্ষে বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচটি এড়িয়ে যেতে পারে।
একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান বোর্ড বর্তমানে ‘অপেক্ষা করো এবং দেখো’ নীতি অনুসরণ করছে। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো গ্রুপ পর্বের প্রথম দুটি ম্যাচ। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডস এবং ১০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা রয়েছে বাবর আজমদের। এই দুই ম্যাচে জয় নিশ্চিত করতে পারলে পাকিস্তানের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যদি পাকিস্তান তাদের প্রথম দুই ম্যাচে জয় পায়, তবে ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে না নামার সম্ভাবনা প্রবল। গাণিতিক হিসেবে তখন একটি ম্যাচ না খেললেও পাকিস্তানের পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার পথ খোলা থাকবে। এমন এক ‘কৌশলগত বয়কট’ দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) কড়া বার্তা দিতে চায়।
তবে এই প্রতিবাদের পথ মোটেও মসৃণ নয়। পিসিবির আইন উপদেষ্টারা বোর্ডকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বিশ্বকাপের মতো আসর বা বিশেষ করে ভারতের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ বর্জন করলে এর ‘রাজনৈতিক, আইনি ও আর্থিক’ পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ। সম্প্রচার স্বত্বের জটিলতা এখানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৭ সাল পর্যন্ত আইসিসির সঙ্গে জিওস্টার স্পোর্টসের প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল সম্প্রচার চুক্তি রয়েছে। এই আয়ের একটি বড় অংশ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের ওপর নির্ভরশীল। পাকিস্তান যদি এই ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আইসিসির বিরুদ্ধে বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ মামলা করতে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষতির দায়ভার পিসিবির কাঁধেই এসে পড়বে এবং আইসিসি থেকে তাদের বার্ষিক তহবিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
পিসিবি অবশ্য কেবল আর্থিক দিক ভাবছে না। বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় আইসিসির প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে অসন্তোষ প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। লাহোর থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, বিশ্বকাপ চলাকালে মাঠের ভেতরে বা বাইরে কীভাবে প্রতিবাদ জানানো যায়, তা নিয়ে আইসিসিকে একটি চিঠি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বোর্ড। আগামী সোমবারের মধ্যেই এই বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো ঘোষণা আসতে পারে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এখন শাঁখের করাতের ওপর দাঁড়িয়ে। একদিকে ঘরোয়া জনমত আর প্রতিবেশী বাংলাদেশের প্রতি সংহতি প্রকাশের চাপ, অন্যদিকে আইসিসির কঠোর নিষেধাজ্ঞা আর আর্থিক ক্ষতির ভয়। আগামী রোববার লাহোরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ শেষ হওয়ার পরপরই হয়তো স্পষ্ট হবে, পাকিস্তান আসলে কোন পথে হাঁটছে।
আইসিসি অবশ্য এখনো আশাবাদী যে শেষ মুহূর্তে সব জটিলতা কেটে যাবে। কিন্তু ক্রিকেট বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদের দিকে—সেখান থেকেই নির্ধারিত হবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ভাগ্য এবং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশের মাঠের লড়াই।

