প্রায় দুই দশক পর ধুলোবালি আর রাজনীতির চেনা শহর ময়মনসিংহে পা রাখলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় মঙ্গলবার দুপুরে তিনি যখন ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছান, তখন রাজপথ জুড়ে ছিল নেতাকর্মীদের গগনবিদারী স্লোগান আর উৎসবের আমেজ।
মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ঢাকার গুলশান থেকে সড়কপথে যাত্রা শুরু করেন তারেক রহমান। দুপুর গড়াতেই তাঁর গাড়িবহর ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করে। দীর্ঘ ২১ বছর পর প্রিয় নেতাকে সামনে থেকে দেখার জন্য সকাল থেকেই সার্কিট হাউস মাঠের চারপাশ ছিল লোকারণ্য। কেউ এসেছেন নেত্রকোনা থেকে, কেউবা শেরপুর কিংবা জামালপুর থেকে।
স্থানীয় সার্কিট হাউসে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর বিকেলে ঐতিহাসিক সার্কিট হাউস মাঠের জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখার কথা রয়েছে তাঁর। মাঠের চারপাশ সাজানো হয়েছে প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং তারেক রহমানের বিশালাকার ছবি ও ব্যানারে। তবে এই উৎসবমুখর পরিস্থিতির আড়ালে জেলায় দলের ভেতরকার এক অস্বস্তিকর চিত্রও ফুটে উঠছে।
ময়মনসিংহ জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৮টিতেই এবার বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা ভোটের মাঠে রয়ে গেছেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করা এই নেতাদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাবশালী। আর এই অভ্যন্তরীণ বিভক্তিই এখন বিএনপির হাই কমান্ডের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো আভাস দিচ্ছে, এই আটটি আসনের মধ্যে অন্তত পাঁচটিতেই মূল প্রার্থীর চেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা কোনো অংশে কম নয়। অনেক জায়গায় মূল স্রোতের নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থনে পর্দার আড়ালে কাজ করছেন। এমনকি আজকের এই কেন্দ্রীয় জনসভাতেও অনেক প্রভাবশালী নেতার অনুসারীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি।
মাঠে থাকা সাধারণ নেতাকর্মীদের বক্তব্যেও ফুটে উঠছে এক ধরণের জটিল হিসাব। তাঁদের মতে, ময়মনসিংহের নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণে আওয়ামী লীগের একটি বড় ভোট ব্যাংক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। আওয়ামী লীগের ভোটাররা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে ঝুঁকবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে অনেক আসনের ভাগ্য।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয় স্থানীয় বিএনপি। তাঁদের দাবি, ফুলবাড়িয়া আসন ছাড়া জেলার বাকি এলাকাগুলোতে জামায়াতের তেমন কোনো সাংগঠনিক প্রভাব নেই। ফলে মূল লড়াইটা এখন ধানের শীষের প্রার্থীর বনাম নিজ দলেরই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
নেত্রকোনা থেকে সমাবেশে আসা ছাত্রদল নেতা মো. আব্দুস সালাম বলেন, “নেতাকে দেখতে আসছি, এটাই বড় পাওয়া। তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটে গেলে আমাদের জয় আরও সহজ হতো।” তাঁর মতো হাজারো সমর্থক এখন নেতার মুখ থেকে ঐক্যের ডাক শোনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
তারেক রহমানের এই সফরকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মোড়ে মোড়ে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বিশেষ টিম। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে জনসভার আশপাশের রাস্তায় যানবাহন চলাচল সীমিত রাখা হয়েছে।
ময়মনসিংহের কর্মসূচি শেষে তারেক রহমান আজই গাজীপুরের রাজবাড়ী মাঠ এবং উত্তরার আজমপুর ঈদগাহ মাঠে আরও দুটি নির্বাচনী জনসভায় অংশ নেবেন। গত ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে শুরু হওয়া এই দেশব্যাপী নির্বাচনী সফরের অংশ হিসেবে তিনি পর্যায়ক্রমে রাজশাহী, নওগাঁ ও বরিশাল সফর করবেন।
ময়মনসিংহের এই জনসভা থেকে তারেক রহমান বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারে কোনো কঠোর বার্তা দেবেন কি না, কিংবা ভোটারদের মন জয়ে নতুন কী প্রতিশ্রুতি দেবেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে স্থানীয় রাজনীতি সচেতন মহল। তবে বিদ্রোহের এই কাঁটা উপড়ে না ফেলতে পারলে, ভোটের মাঠে বিএনপিকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

