ইরানের রাজপথ এখন শোক আর বারুদের গন্ধে ভারী। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন রূপ নিয়েছে এক বিশাল গণআন্দোলনে। আর এই আন্দোলন দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান ইরানকে ঠেলে দিয়েছে এক ভয়াবহ রক্তপাতের দিকে। যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) সোমবার এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬ হাজার মানুষের প্রাণহানি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এএফপির বরাতে জানা যায়, গত ৮ জানুয়ারি থেকে এই বিক্ষোভ ইরানের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন দমনে দেশটির শাসকগোষ্ঠী কেবল সরাসরি গুলিই ব্যবহার করেনি, বরং তথ্যপ্রবাহ রুখতে পুরো দেশে নজিরবিহীনভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে। টানা ১৮ দিন ধরে চলা এই ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট’কে অনেকে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় দমন অভিযান হিসেবে দেখছেন।
এইচআরএএনএ-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিহত ৫ হাজার ৮৪৮ জনের মধ্যে ২০৯ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য থাকলেও বাকিরা সাধারণ বিক্ষোভকারী। তবে আশঙ্কার কথা হলো, সংস্থাটি আরও ১৭ হাজার ৯১ জনের সম্ভাব্য মৃত্যুর খবর খতিয়ে দেখছে। এর বাইরেও অন্তত ৪১ হাজার ২৮৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও গত সপ্তাহে ইরান সরকার মাত্র ৩ হাজার ১১৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছিল, যার দায় তারা চাপিয়েছিল ‘দাঙ্গাবাজদের’ ওপর।
এদিকে ইরানের এই অভ্যন্তরীণ সংকটে উত্তাপ ছড়াচ্ছে ওয়াশিংটনের ভূমিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরুতে সরাসরি হস্তক্ষেপের বিষয়ে কিছুটা নমনীয় থাকলেও, বর্তমানে সুর বদলেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সামরিক হস্তক্ষেপের বিকল্প এখনো তার টেবিলে রয়েছে। প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য তিনি মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিশাল নৌবহর পাঠানোরও ঘোষণা দিয়েছেন। এই পদক্ষেপকে ইরান তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছে।
তেহরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ বা আগ্রাসনের জবাবে তারা ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দিতে প্রস্তুত। তেহরান মনে করে, বাইরে থেকে ইন্ধন জোগানোর ফলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, বাইরের সাহায্য নয়, বরং দীর্ঘদিনের শোষণ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্খাই তাদের রাজপথে নামিয়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে ইরানে হতাহতের প্রকৃত চিত্র পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘নেটব্লকস’ বলছে, এই শাটডাউন বা ব্ল্যাকআউট মূলত বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে চালানো প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের ভয়াবহতাকে বিশ্ববাসীর কাছ থেকে আড়াল করার একটি কৌশল। ফার্সি ভাষার সংবাদমাধ্যম ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ তো দাবি করেছে যে, মাত্র দুই দিনে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন ৩৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। যদিও নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্বের টিকে থাকার লড়াই, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পরিবর্তনের তীব্র তৃষ্ণা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে বড় ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার আহ্বান জানাচ্ছে যেন ইরানে অবিলম্বে ইন্টারনেট চালু করা হয় এবং একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে এই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু তেহরানের কঠোর মনোভাব আর ওয়াশিংটনের রণসজ্জা দেশটিকে কোন পরিণতির দিকে নিয়ে যায়, তা এখন দেখার বিষয়।

