বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী কণ্ঠস্বর এবং দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার মহীরুহ মার্ক টালি আর নেই। রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিবিসির এই সাবেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। বিবিসি হিন্দি বিভাগ তার চিরপ্রস্থানের সংবাদটি নিশ্চিত করেছে।
১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার টালিগঞ্জে এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেওয়া মার্ক টালির নাড়ির টান ছিল এই মাটির সঙ্গেই। শৈশব কলকাতায় কাটলেও ৯ বছর বয়সে তিনি ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। তবে ভাগ্য তাকে বারবার এই উপমহাদেশেই ফিরিয়ে এনেছে। ১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেওয়ার ঠিক পরের বছরই তিনি নয়াদিল্লি ব্যুরোর দায়িত্ব নিয়ে ভারতে আসেন, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চলের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থেকেছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন মার্ক টালি ছিলেন সত্যের এক নির্ভীক দূত। সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে পাকিস্তান সরকারের কড়াকড়ি উপেক্ষা করে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসার অনুমতি পান। তার সঙ্গে ছিলেন দ্য টেলিগ্রাফের খ্যাতনামা যুদ্ধ সংবাদদাতা ক্লেয়ার হলিংওয়ার্থ।
এক সাক্ষাৎকারে সেই ভয়াবহ স্মৃতি চারণ করে মার্ক টালি বলেছিলেন, “পাকিস্তানি বাহিনী যখন মনে করেছিল সীমান্ত পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কেবল তখনই আমাদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা স্বাধীনভাবে ঘুরে দেখার সুযোগ পাওয়ায় প্রকৃত চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে পেরেছিলাম।” ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে মাইলের পর মাইল গ্রামের ধ্বংসস্তূপ আর পুড়িয়ে দেওয়া ঘরবাড়ি দেখে তিনি শিহরিত হয়েছিলেন। তার পাঠানো প্রতিটি সংবাদ তখন অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের কাছে ছিল আশার আলো, আর বিশ্ববাসীর কাছে ছিল বর্বরতার অকাট্য দলিল।
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে। ১৯৯৪ সালে বিবিসি থেকে অবসরে যাওয়ার পরও তিনি ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে নিয়মিত কাজ করে গেছেন। তার প্রয়াণে দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতা জগতের একটি বর্ণিল অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
নয়াদিল্লির নিজ বাসভবনেই তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান বলে জানা গেছে। ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ধারা তার কলমে যেভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল, তা বিশ্ব সাংবাদিকতায় তাকে অমর করে রাখবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও ভারতের রাষ্ট্রপতি পৃথক শোক বার্তায় এই মহান সাংবাদিকের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন।

