দীর্ঘ দুই দশক পর বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে উত্তাল জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আগামীর বাংলাদেশের এক নতুন স্বপ্ন ও উন্নয়নের রূপরেখা পেশ করলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে আয়োজিত এই মহাসমাবেশে তিনি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যই দেননি, বরং জলাবদ্ধতা নিরসন থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান ও ব্যাংক ঋণ সহজ করার মতো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। স্মৃতিরোমন্থন আর আগামীর অঙ্গীকারে ঠাসা তার এই বক্তব্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় দলের প্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে পৌঁছালে তারেক রহমানকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। শাহ আমানত বিমানবন্দরে হাজার হাজার নেতাকর্মীর স্লোগানে মুখরিত পরিবেশের মধ্য দিয়ে তিনি রেডিসন ব্লু হোটেলে রাত্রিযাপন করেন।
পরদিন সকালে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে ‘দ্য প্ল্যান: ইয়ুথ পলিসি টক’ শীর্ষক এক ব্যতিক্রমী মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তিনি। সেখানে তরুণদের অভাব-অভিযোগ শোনার পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ ভাবনার কথা শেয়ার করেন।
চট্টগ্রামের চিরচেনা জলাবদ্ধতা সমস্যা নিয়ে তারেক রহমান এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের দুঃখ জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা পুরো দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের উদ্যোগ নেব। পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনাই হবে আমাদের অগ্রাধিকার।”
এছাড়া বায়ুদূষণ মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে ৫০ কোটি গাছ লাগানোর এক বিশাল লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন তিনি। প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে নার্সারির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে এই সবুজ বিপ্লব সফল করার পরিকল্পনাও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের দেশের মেধাবী তরুণরা ঋণের অভাবে উদ্ভাবনী কিছু করতে পারছে না। আমরা ব্যাংক ঋণের জটিলতা কমিয়ে উদ্যোক্তাদের জন্য দুয়ার খুলে দেব।” এছাড়াও বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের ‘স্টুডেন্ট লোন’ বা শিক্ষঋণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতে বিএনপির আমলেই এখানে ইপিজেডগুলো প্রাণ পেয়েছিল। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতায় গেলে নতুন নতুন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থেই দেশের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
জনসভায় তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ বা জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “দুর্নীতির টুঁটি আমরা চেপে ধরব। অতীতে বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে সুশাসন নিশ্চিত করেছিলেন, আমরা সেই পথেই হাঁটব। আমার দলের কেউ যদি অন্যায়ে জড়িত হয়, তাকেও বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।” আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ‘কৃষক কার্ড’ চালুর মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে আবেগাপ্লুত তারেক রহমান বলেন, এই চট্টগ্রাম থেকেই তার পিতা শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং এই মাটি থেকেই তার মা দেশনেত্রী উপাধি পেয়েছিলেন। তাই চট্টগ্রামের সঙ্গে তার আত্মার সম্পর্ক।
উপস্থিত জনতার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “ভোটের দিন ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের অধিকার রক্ষা করুন। ধানের শীষের বিজয়ের মাধ্যমেই জনগণের বিজয় নিশ্চিত হবে।” ২০০৫ সালের পর চট্টগ্রামের কোনো জনসভায় এটিই ছিল তার প্রথম সরাসরি অংশগ্রহণ, যা নেতাকর্মীদের মাঝে এক অভাবনীয় প্রাণের সঞ্চার করেছে।

