আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হলো বিশ্ব। আসন্ন ত্রয়োদশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক টানাপোড়েন, নিরাপত্তার অজুহাত এবং আইসিসির সঙ্গে অনড় অবস্থানের পর অবশেষে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের ছাড়াই মাঠে গড়াবে এই বিশ্ব আসর। বাংলাদেশের পরিবর্তে গ্রুপ-সি’তে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে স্কটল্যান্ডকে। ক্রিকেটের মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই প্রশাসনিক টেবিলে হার মানল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
এই সংকটের সূত্রপাত মূলত ভারতের মাটিতে গিয়ে খেলতে না চাওয়ার বিষয়ে বিসিবির অনমনীয় মনোভাব থেকে। সাম্প্রতিক ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে সৃষ্ট জটিলতা আগুনি ঘি ঢেলেছে। বিসিবির দাবি ছিল, ভারতে তাদের ক্রিকেটার ও দর্শকদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি ‘মাঝারি থেকে উচ্চ’। তবে আইসিসির নিরপেক্ষ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়েছিল, হুমকির মাত্রা আসলে ‘নিম্ন থেকে মাঝারি’, যা টুর্নামেন্টের অন্য দলগুলোর মতোই স্বাভাবিক।
ঘটনার নেপথ্যে থাকা বড় একটি প্রভাবক ছিল আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) দল থেকে পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের ছিটকে যাওয়া। বিসিসিআই-এর নির্দেশে কেকেআর তাকে ছেড়ে দিলে বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরপরই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিসিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়, জাতীয় দলের মর্যাদা ও নিরাপত্তার স্বার্থে যেন ভারতের মাটিতে না খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল স্পষ্ট করে দেন, “জাতীয় মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে দল ভারতে যাবে না।”
বিসিবি দাবি করেছিল তাদের ম্যাচগুলো ভারতের পরিবর্তে সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার জন্য। তবে আইসিসি এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত আইসিসির বোর্ড সভায় ১৪-২ ব্যবধানে বাংলাদেশের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। পাকিস্তান ছাড়া অন্য কোনো সদস্য দেশ বাংলাদেশের দাবি সমর্থন করেনি। আইসিসি মনে করেছে, কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া শেষ মুহূর্তে সূচি পরিবর্তন করলে তা ভবিষ্যতের টুর্নামেন্টগুলোর নিরপেক্ষতা নষ্ট করবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বুলবুল আইসিসির সঙ্গে একাধিক ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিলেও কোনো রফাদফা হয়নি। আইসিসি বিসিবিকে ২৪ ঘণ্টার একটি চূড়ান্ত আলটিমেটাম দেয়। কিন্তু বিসিবি তাদের অবস্থানে অটল থাকে। শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) চলাকালে খেলোয়াড়দের খেলার আগ্রহ থাকলেও বোর্ড শেষ পর্যন্ত সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বাইরে যায়নি।
বিশ্বকাপ থেকে এই ছিটকে পড়ার প্রভাব মাঠের বাইরেও সুদূরপ্রসারী হতে যাচ্ছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কট করায় আইসিসির লভ্যাংশ, স্পনসরশিপ ও সম্প্রচার স্বত্ব বাবদ বাংলাদেশ প্রায় ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা) ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এছাড়া আইসিসির নীতিমালা অনুযায়ী বড় ধরনের জরিমানার শঙ্কাও রয়েছে। অনেক সিনিয়র ক্রিকেটারের ব্যক্তিগত এন্ডোর্সমেন্ট ও ব্র্যান্ড চুক্তিও এখন ঝুঁকির মুখে।
বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ক্রিকেট বিশ্বে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার শহীদ আফ্রিদি আইসিসির ‘দ্বিমুখী নীতির’ সমালোচনা করে বলেছেন, ভারতের বেলায় পাকিস্তান না যাওয়ার সিদ্ধান্ত আইসিসি মানলেও বাংলাদেশের বেলায় কেন নয়? অন্যদিকে, স্কটল্যান্ড এই সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত। তারা এখন গ্রুপ-সি’তে নেপাল, ইতালি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়বে। বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের জন্য এটি একটি কষ্টের দিন, কারণ প্রিয় দলকে ছাড়াই ২০২৬ সালের এই মেগা ইভেন্ট উপভোগ করতে হবে তাদের।

