২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অস্বীকৃতি এবার আইনি লড়াইয়ের পথে ধাবিত হচ্ছে।
বিসিবি সম্প্রতি আইসিসিকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে তারা এই সংকটের সমাধানে আইসিসির স্বাধীন বিবাদ নিষ্পত্তি কমিটির (Dispute Resolution Committee – DRC) সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। বাংলাদেশের সাফ কথা—ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় না নিলে তারা এই বিশ্বমঞ্চে অংশ নেবে না।
আইসিসি গত বোর্ড সভায় বাংলাদেশকে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার জন্য সময় দিয়েছিল। তবে সেই সময়সীমা পার হলেও বিসিবি তাদের আগের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিসিবি আশাবাদী যে আইসিসি তাদের দাবিটি গুরুত্বসহকারে দেখবে এবং বিষয়টি স্বাধীন আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত ডিআরসি-র কাছে পাঠাবে।
এই বিবাদ নিষ্পত্তি কমিটি মূলত একটি স্বাধীন সালিশি সংস্থা। এটি ইংরেজি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং এর কার্যক্রম সাধারণত লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়। আইসিসি সংক্রান্ত যেকোনো বড় ধরনের বিরোধ মেটানোই এই কমিটির কাজ। এটি কেবল একটি আপিল ফোরাম নয়; বরং আইসিসির নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বৈধতা যাচাই করার ক্ষমতাও রাখে এই সংস্থাটি।
উল্লেখ্য, ডিআরসি-র রায় চূড়ান্ত এবং বাধ্যতামূলক হিসেবে গণ্য করা হয়। অত্যন্ত সীমিত কিছু পদ্ধতিগত ত্রুটি ছাড়া এই রায়ের বিরুদ্ধে পুনরায় আপিল করার কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে বিসিবি এখন এই চূড়ান্ত আইনি পথেই হাঁটতে চাইছে, যাতে নিরপেক্ষভাবে ভেন্যু পরিবর্তনের দাবিটি যাচাই করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। আইপিএল থেকে মুস্তাফিজুর রহমানকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিসিবি ও ভারতীয় ক্রিকেট মহলের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়। পরবর্তীতে এই ইস্যুটি জাতীয় আবেগ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে রূপ নেয়। বিসিবি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের মাটিতে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি থাকায় তারা সেখানে দল পাঠাবে না।
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সরকারের এই অবস্থানের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। যদিও ভারতের পক্ষ থেকে দেওয়া নিরাপত্তা প্রতিবেদনে কোনো সুনির্দিষ্ট ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়নি, তবুও বাংলাদেশ তাদের অবস্থানে অনড়।
আইসিসি এর আগে বিসিবির ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি নাকচ করে দিয়েছিল। সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নিরাপত্তা রিপোর্টে কোনো ত্রুটি না থাকায় ভেন্যু পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নেই। কিন্তু বিসিবির নতুন এই চিঠিতে বিষয়টি আইনি লড়াইয়ের দিকে চলে যাওয়ায় আইসিসিকে এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ বর্জন করে, তবে তার ফল হবে সুদূরপ্রসারী। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশগ্রহণ না করলে র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকা স্কটল্যান্ড তাদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। তবে মূল ক্ষতিটা হবে আর্থিক এবং কৌশলগত।
বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বিসিবি আইসিসি থেকে পাওয়া তাদের বার্ষিক আয়ের একটি বিশাল অংশ হারাবে। যার পরিমাণ প্রায় ৩২৫ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, ২০৩১ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ আয়োজনের যৌথ স্বাগতিক হওয়ার যে সম্ভাবনা বাংলাদেশের রয়েছে, সেটিও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
আইসিসি এখনো বিসিবির সর্বশেষ চিঠির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। তবে ক্রিকেট বিশ্বে এখন একটাই প্রশ্ন—লন্ডনের বিবাদ নিষ্পত্তি কমিটি কি বাংলাদেশের দাবির সপক্ষে রায় দেবে? নাকি ভারত বনাম বাংলাদেশের এই ক্রিকেটীয় লড়াই মাঠের বাইরেই শেষ হয়ে যাবে বড় কোনো ক্ষতির বিনিময়ে?
আপাতত মিরপুর থেকে দুবাই, সব চোখ এখন আইসিসির পরবর্তী বার্তার দিকে। কারণ এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে ২০২৬ বিশ্বকাপের ভাগ্য এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ গতিপথ।

