ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিয়ে নাটকীয়তা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের অবস্থানে অনড়—নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভারতে নয়, কেবল শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ হলেই অংশ নেবে বাংলাদেশ। আজ (২৩ জানুয়ারি) বিসিবির এই চূড়ান্ত বার্তার পর বিশ্ব ক্রিকেটে বইছে ঝড়ের আভাস। তবে এই ‘না’ বলার পেছনে লুকিয়ে আছে এক বিশাল অংকের আর্থিক লোকসানের হিসাব।
যদি শেষ পর্যন্ত টাইগাররা বিশ্বকাপে অংশ না নেয়, তবে কেবল মাঠের লড়াই নয়, বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশের ক্রিকেট। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল অংশগ্রহণ ফি বাবদ বিসিবি হারাবে প্রায় ৪ কোটি টাকা। আর যদি দল সেরা বারো-তে জায়গা করে নিতে পারত, তবে সেই অংকটা দাঁড়াত প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকারও বেশি।
এই ক্ষতির আঁচ সরাসরি লাগবে ক্রিকেটারদের পকেটেও। বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচ খেলার জন্য একজন ক্রিকেটার ম্যাচ ফি ছাড়াও পারফরম্যান্স বোনাস এবং প্রাইজমানি পেয়ে থাকেন। বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্তে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এসব ব্যক্তিগত আয় থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হবেন। মাঠের লড়াইয়ে জেতার যে আর্থিক পুরস্কার, তা অধরাই থেকে যাবে লিটন-তাসকিনদের কাছে।
বিসিবির জন্য এই লোকসান কেবল অংশগ্রহণ ফির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আইসিসির কাছ থেকে লভ্যাংশ হিসেবে বড় একটি অংক প্রতি বছর বিসিবির তহবিলে আসে। বিশ্বকাপ বর্জনের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত আইসিসির সঙ্গে বিসিবির বাণিজ্যিক সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারে। এতে ভবিষ্যতে আইসিসি থেকে প্রাপ্ত অনুদান বা উন্নয়ন তহবিলের অর্থ প্রাপ্তিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ক্ষতিটা কেবল বাংলাদেশের একার নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসিও বড় ধরনের বাণিজ্যিক ধাক্কা খাবে। ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলাদেশের ম্যাচের রয়েছে বিশাল এক দর্শকপ্রিয়তা। সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ভিউয়ারশিপ বা টিআরপির ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন বিক্রি করে। বাংলাদেশ না থাকা মানে ২০ কোটি সম্ভাব্য দর্শক হারানো, যা টুর্নামেন্টের সামগ্রিক বাণিজ্যিক মূল্য কমিয়ে দেবে।
সাবেক ক্রিকেটার ও ক্রীড়া বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশ না খেললে স্পনসরদের আগ্রহেও ভাটা পড়বে। কারণ, বিজ্ঞাপনদাতারা সবসময় বড় বাজার খুঁজে বেড়ায়, আর বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেই বিশাল বাজারটি হারানো মানেই আইসিসির আয়ের খাত থেকে বড় অংক খসে যাওয়া। যদিও সম্প্রচার স্বত্ব আগেভাগে বিক্রি হয়ে যায়, তবুও মাঠের লড়াইয়ে দর্শক খরা সম্প্রচারক সংস্থাগুলোর দীর্ঘমেয়াদী লোকসান ডেকে আনবে।
২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রাইজমানির ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, বর্তমান ক্রিকেটে অর্থকড়ির ঝনঝনানি কতটা বেশি। সেবার রানার্সআপ দল পেয়েছিল প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এমনকি যারা দ্বিতীয় রাউন্ড পার হতে পারেনি, তারাও প্রায় ৪ লাখ ডলারের কাছাকাছি অর্থ পকেটে পুরেছিল। ২০২৬ আসরে এই অংক আরও বাড়ার কথা ছিল, যা এখন বাংলাদেশের জন্য সুদূরপরাহত।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর নিরাপত্তার অজুহাতে বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানো হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এক চরম চড়া মূল্যের সিদ্ধান্ত। একদিকে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারের বড় সুযোগ হাতছাড়া হওয়া, অন্যদিকে বোর্ডের কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর শঙ্কা—সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছে দেশের ক্রিকেট।

