আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে করা একটি জনস্বার্থ মামলা সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন ভারতের দিল্লির হাইকোর্ট। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কথিত সহিংসতার অভিযোগ তুলে এই পিটিশনটি দায়ের করা হয়েছিল। তবে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, অন্য কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ড বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার এখতিয়ার আদালতের নেই।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রধান বিচারপতি দেবেন্দ্র কুমার উপাধ্যায় এবং বিচারপতি তেজাস কারিয়ার সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেন। শুনানির শুরুতেই আদালত আবেদনকারীর উদ্দেশ্য এবং মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলেন। আদালত বলেন, এই ধরনের পিটিশন দাখিল করা মানে বিচারবিভাগের মূল্যবান সময় নষ্ট করা।
শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি দেবেন্দ্র কুমার উপাধ্যায় পর্যবেক্ষণ দেন যে, কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সরকারের নির্বাহী বিভাগের বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত। তিনি বলেন, “পিটিশনে যা চাওয়া হয়েছে, তা ভারতের বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাথে যুক্ত। আদালত এ ধরনের রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দিতে পারে না।”
আদালত আরও স্পষ্ট করেন যে, ভারতীয় সংবিধানের ২২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে আদালতের যে বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে, তা কোনো বিদেশি সরকার বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর মতো সংস্থার ওপর প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। এ সময় বেঞ্চ আবেদনকারীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এ ধরনের আবেদন ভিত্তিহীন এবং আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার।
আদালতে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ভারতের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি আদালতকে জানান, এই পিটিশনের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। আবেদনকারী কোনো যৌক্তিক প্রমাণ ছাড়াই বিদেশি ক্রিকেট বোর্ডগুলোকে এই মামলায় পক্ষভুক্ত করেছেন।
তুষার মেহতা আরও বলেন, খেলাধুলা এবং রাজনীতিকে আলাদা রাখা উচিত এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে কোনো দেশকে নিষিদ্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত কেবল আন্তর্জাতিক সংস্থাই নিতে পারে, দেশের আদালত নয়। আদালতের কঠোর অবস্থানের মুখে পিটিশনকারী শেষ পর্যন্ত আবেদনটি প্রত্যাহারের অনুমতি চান এবং আদালত তা মঞ্জুর করে মামলাটি খারিজ করে দেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর ভারত ও বাংলাদেশের ক্রিকেট মহলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের কট্টরপন্থী কিছু গোষ্ঠী বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের সাথে সব ধরনের খেলাধুলা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল।
দিল্লি হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে উগ্রপন্থীদের আইনি পথে বাংলাদেশকে কোণঠাসা করার চেষ্টা ব্যর্থ হলো বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে এই রায় বাংলাদেশের জন্য একটি স্বস্তির খবর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লির হাইকোর্টের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে ভারত সরকার বা বিচারবিভাগ প্রতিবেশী দেশের সাথে ক্রীড়া সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার পক্ষে নয়। যদিও বিসিবি এবং আইসিসির মধ্যে নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে টানাপোড়েন চলছে, তবে আদালতের এই রায় ক্রিকেটীয় কূটনীতিতে এক ধরনের স্থিতিশীলতা আনবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) অবশ্য ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে এখনো তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে আসছে। তবে ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আইনি সংস্থা থেকে এ ধরনের পর্যবেক্ষণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সংহত করল।

