রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আর সি মজুমদার মিলনায়তনে এক আবেগঘন পরিবেশে জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার এবং চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণকারী যোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সংহতি প্রকাশ করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে ‘নির্বাচনী ইশতেহার ও গণভোট: প্রতিবন্ধীদের অধিকার প্রসঙ্গ’ শীর্ষক এক বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় নির্বাহী কমিটির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক নিলুফার চৌধুরী মনি এই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং ডিজাবিলিটি রাইটস বাংলাদেশ (ডিয়ারবি) যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে, যেখানে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিতের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, যারা জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার কিংবা চব্বিশের ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানে রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে জীবনবাজি রেখে প্রতিবন্ধী হয়েছেন, তারা সমগ্র জাতির জন্য সাহসিকতা ও প্রেরণার অবিরাম উৎস। তাদের এই আত্মত্যাগ ও সংগ্রামকে জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে। বিএনপি নেত্রী তার বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর দেশে প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী ভাতা চালু করেছিল, যা ছিল এই জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষার একটি মাইলফলক। তবে অভিযোগ করে তিনি বলেন, পরবর্তীতে একটি ফ্যাসিস্ট সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে সেই ভাতার অর্থ অপচয় ও লুটতরাজ করেছে। তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, ভবিষ্যতে বিএনপি পুনরায় জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসলে প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে এবং তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধায় কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়ে নিলুফার মনি দাবি করেন, প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে এবং জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রতিবন্ধীদের অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যতীত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অধিকার সবার থাকা উচিত। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী যদি তাদের অধিকার আদায়ের বিষয়ে সচেতন ও সচেষ্ট থাকে, তবে বিএনপি সর্বদাই তাদের পাশে থেকে সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। তার বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের প্রতি সমবেদনা ও শ্রদ্ধা বারংবার ফুটে ওঠে, যা উপস্থিত দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের মানবিক ও সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মর্যাদার দিক থেকে মানুষ হিসেবে আমরা সবাই সমান। সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে মূলধারার উন্নয়ন ও আলোচনা থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে কোনোভাবেই একটি আদর্শ বা সুষ্ঠু সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে ব্যবধান থাকে, তা দূর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী তাদের আগামী নির্বাচনী ইশতেহারে সামর্থ্যের মধ্যে যা করা সম্ভব, ঠিক সেই বিষয়গুলোই অন্তর্ভুক্ত করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তারা অতীতে দেখা যাওয়া ‘১০ টাকায় চাল’ এর মতো কোনো চটকদার বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চান না।
সেমিনারে বৈশ্বিক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং ডিয়ারবি-র উপদেষ্টা ড. সাইদুর রহমান। তিনি তথ্য প্রদান করেন যে, বর্তমান বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে যদি যথাযথ কর্মসংস্থানের আওতায় আনা না যায়, তবে তারা পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিপন্থী।
তিনি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিবন্ধীদের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান। একইসাথে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সভাপতি মনসুর আহমেদ চৌধুরী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধীদের সমান অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তি যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই পরিবেশ ও কারিগরি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
সভার সমাপনী বক্তব্যে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ‘অদম্য মেধাবী’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বিগত ৫৪ বছরের জাতীয় রাজনীতিতে কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক দলই প্রতিবন্ধীদের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে কার্যকর বা যুগান্তকারী কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ডাকসু এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীর পাশে থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের প্রতিটি যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবিতে ডাকসু রাজপথে এবং প্রশাসনিক টেবিলে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
সেমিনার শেষে ‘ডিজাবিলিটি রাইটস বাংলাদেশ’-এর নতুন কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটি ঘোষণা করা হয়। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে সভাপতি হিসেবে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সম্পাদক মো. রাইসুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সুব্রত কুমার দায়িত্ব লাভ করেন। একইসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে নাইমুল ইসলাম নাইম ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জান্নাতুল সেতুর নাম ঘোষণা করা হয়। নবগঠিত এই কমিটি আগামীতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করার শপথ গ্রহণ করে।

