বাংলাদেশের প্রচলিত নির্বাচনী সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। কালো টাকা আর ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীদের অর্থনির্ভর রাজনীতির বলয় ভেঙে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণে নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছেন দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই নতুন রাজনৈতিক কৌশলের কথা জানান। আসিফ মাহমুদ স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে আসিনি। জনগণের ছোট ছোট অনুদানে আমরা নির্বাচন লড়তে চাই, যাতে আমাদের প্রতিনিধিরা সংসদে গিয়ে কেবল সাধারণ মানুষের কাছেই দায়বদ্ধ থাকেন।”
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ জানান, জাতীয় নাগরিক পার্টি কেন্দ্রীয়ভাবে ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ বা গণ-তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার মতে, প্রার্থীদের ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ। দাতারা চাইলে সরাসরি দলকে অথবা তাদের পছন্দমতো নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে পারবেন।
স্বচ্ছতার প্রশ্নে আসিফ মাহমুদ এক বিশেষ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনী তহবিলে কত টাকা জমা হলো এবং কোথায় তা খরচ করা হলো, তার প্রতিটি হিসাব বছর শেষে পেশাদার অডিটের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। এই অডিট রিপোর্টটি সম্পূর্ণ প্রকাশ্য রাখা হবে, যাতে দেশের যেকোনো নাগরিক তা দেখে দলের স্বচ্ছতা যাচাই করতে পারেন।
দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তুলনায় নিজেদের স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরে আসিফ মাহমুদ বলেন, “যখন আমরা অন্যের স্বচ্ছতা বা নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলি, তখন নিজেদের ক্ষেত্রেও সেই একই মানদণ্ড বজায় রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।” তিনি দাবি করেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থীদের মধ্যে কোনো হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি নেই, নেই কোনো বিদেশি নাগরিকত্ব কিংবা বিদেশে অবৈধ সম্পদের পাহাড়। এটিই তাদের রাজনীতির মৌলিক পার্থক্য বলে তিনি মনে করেন।
জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে আসিফ মাহমুদ বলেন, তাদের দলের অধিকাংশ প্রার্থীই তরুণ পেশাজীবী। এদের মধ্যে অনেকে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে এসেছেন, আবার কেউ সদ্য পড়াশোনা শেষ করা প্রাক্তন শিক্ষার্থী। হলফনামা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, হাতেগোনা কয়েকজন বাদে কেউই আগে থেকে কোটিপতি বা আর্থিকভাবে খুব বেশি সচ্ছল নন। তাদের প্রধান শক্তিই হলো সাধারণ মানুষের সমর্থন।
নির্বাচনী রাজনীতিতে পুঁজিবাদের প্রভাব নিয়ে আসিফ মাহমুদ এক কড়া সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, “যদি কোনো প্রার্থী ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের অর্থে নির্বাচিত হন, তবে তিনি সংসদে গিয়ে জনস্বার্থের বদলে সেই অর্থদাতাদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন।” জাতীয় নাগরিক পার্টি এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে জনগণের পরামর্শ ও সমর্থন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন তিনি। আসিফ মাহমুদ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনারা যাকে যোগ্য মনে করেন, তাকে অনুদান দিয়ে এই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সাহায্য করুন। আপনাদের অর্থে নির্বাচিত হলে আমরা সংসদে কেবল আপনাদের কণ্ঠস্বরই তুলে ধরব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার এই চেষ্টা বেশ সাহসী। এর আগে বিভিন্ন দেশে এ ধরনের মডেল সফল হলেও বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে তরুণ নেতৃত্বের এই আহ্বান ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে আসিফ মাহমুদ পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, রাজনীতি কোনো বিনিয়োগ নয় যেখান থেকে মুনাফা তুলতে হবে। এটি একটি সেবা, আর সেই সেবার উৎস হতে হবে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও ভালোবাসা। জাতীয় নাগরিক পার্টির এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে কি না, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

