ইরানের মাটিতে গত কয়েক সপ্তাহে যে রক্তগঙ্গা বয়ে গেছে, তার এক শিউরে ওঠার মতো পরিসংখ্যান সামনে এনেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘সানডে টাইমস’। দেশটির চিকিৎসকদের গোপন নেটওয়ার্ক থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে, সরকারবিরোধী এই গণবিক্ষোভে এখন পর্যন্ত সাড়ে ১৬ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের সিংহভাগই ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণ এবং কিশোর।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল নিহতের সংখ্যাই নয়, আহতের সংখ্যাও আকাশচুম্বী—প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারাত্মকভাবে জখম হয়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতা চালানো হয়েছে গত ৭ ও ৮ জানুয়ারি, যখন বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার ‘মিলিটারি গ্রেড’ বা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার শুরু করে।
ইরানি-জার্মান চক্ষু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আমির পারাস্তা, যিনি বর্তমানে মিউনিখ আই সেন্টারের পরিচালক, সানডে টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পৈশাচিকতার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি স্রেফ দমন-পীড়ন নয়, এটি অন্য মাত্রার বর্বরতা। আমরা আহতদের মাথায়, গলায় এবং বুকে সরাসরি গুলি ও শার্পনেলের আঘাত দেখতে পেয়েছি। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, নিরাপত্তা বাহিনীকে ওপর থেকে প্রাণঘাতী আঘাত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের আটটি বড় চক্ষু হাসপাতাল এবং ১৬টি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা এই পরিসংখ্যান তৈরিতে সহায়তা করেছেন। সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে দিলেও চিকিৎসকরা দমে যাননি। তারা এলন মাস্কের স্টারলিংক (Starlink) স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন এবং এই তথ্যগুলো পাচার করতে সক্ষম হয়েছেন।
সানডে টাইমসের এই অনুসন্ধানে এক হৃদয়বিদারক তথ্য উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে শটগান ব্যবহার করায় অন্তত ৭০০ জন তরুণ-তরুণী তাদের চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। অনেক হাসপাতালে নিরাপত্তা বাহিনী রক্ত হস্তান্তরে বাধা দেওয়ায় বিনা চিকিৎসায় অনেকের মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকরা অভিযোগ করেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গতকাল শনিবার হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছেন। তবে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করেননি। খামেনি এই রক্তপাতের দায় চাপিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর। তার দাবি, ট্রাম্পের উসকানি ও ইসরায়েলি মদতে ইরানে এই ‘দাঙ্গা’ সৃষ্টি হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে যখন তেহরানসহ বড় শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখল করতে শুরু করে, তখন খামেনি সরকারের পতন অনিবার্য বলে মনে হচ্ছিল। সেই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়েই সরকার চরম মারমুখী অবস্থান নেয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ‘একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে অবিলম্বে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

