ইরান কি উত্তর কোরিয়ার মতো বিশ্বের কাছ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে? সাম্প্রতিক এক গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের উদ্বেগ অন্তত সেই বার্তাই দিচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তেহরান সরকার এবার বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক গোপন ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে, ২০২৬ সালের পর ইরানের সাধারণ নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত ইন্টারনেটের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ফিল্টারওয়াচ’ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরান সরকার ইন্টারনেটকে আর নাগরিক অধিকার হিসেবে নয়, বরং ‘সরকারি বিশেষাধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে। সংস্থার প্রধান আমির রাশিদি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নতুন এই নীতি অনুযায়ী কেবল সরকারের বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়পত্রপ্রাপ্ত বা যাচাইকৃত একদল ব্যক্তিই সীমিত আকারে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। বাকি কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জন্য থাকবে কেবল ‘জাতীয় ইন্টারনেট’।
এই জাতীয় ইন্টারনেট আসলে কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি সমান্তরাল ডিজিটাল জগৎ, যা বৈশ্বিক সার্ভার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। এতে কেবল সরকার অনুমোদিত দেশীয় সার্চ ইঞ্জিন, মেসেজিং অ্যাপ এবং স্ট্রিমিং সেবা (যাকে ‘ইরানি নেটফ্লিক্স’ বলা হচ্ছে) থাকবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার চাইলেই যে কোনো তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং বাইরের জগতের কোনো খবর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
গত ৮ জানুয়ারি থেকে ইরানে শুরু হওয়া দেশব্যাপী ইন্টারনেট শাটডাউন এরই মধ্যে আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘতম ব্ল্যাকআউট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নেটব্লকসের তথ্যমতে, ২০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দেশটি কার্যত অফলাইন। এটি ২০১১ সালের মিশরের তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের সময়কার বিখ্যাত শাটডাউনের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। ইরানের সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি গত কাল ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, অন্তত ২০ মার্চ ইরানি নববর্ষ (নওরোজ) পর্যন্ত এই অচলাবস্থা কাটবে না।
ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের দাবি, ইরানের এই কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা তৈরিতে চীন ও হুয়াওয়ের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘মিডলবক্স’ প্রযুক্তির সাহায্যে সরকার এখন প্রতিটি ডেটা প্যাকেট তদারকি করতে সক্ষম। এতে ভিপিএন বা অন্য কোনো প্রক্সি ব্যবহার করেও বৈশ্বিক ইন্টারনেটে ঢোকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। মূলত বিক্ষোভকারীদের দমনের পাশাপাশি তথ্য গোপনের লক্ষ্যেই এই ‘ডিজিটাল আয়রন কার্টেন’ বা লোহার পর্দা তৈরি করছে খামেনি সরকার।
গত ডিসেম্বরের শেষে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ যখন সহিংস রূপ নেয়, তখন থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে তথ্যপ্রবাহ বন্ধের তোড়জোড় শুরু হয়। রেজা পাহলভির আহ্বানে রাস্তায় নামা মানুষের মিছিল দমনে ইন্টারনেট বিচ্ছেদ বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি স্বীকার করেছেন যে, বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তবে ইন্টারনেট না থাকায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান এই পরিস্থিতি কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়। ২০০৯ সালের বিক্ষোভের পর থেকেই ইরান তার নিজস্ব ‘ন্যাশনাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক’ তৈরির কাজ শুরু করেছিল। ১৬ বছরের সেই দীর্ঘ পরিকল্পনারই চূড়ান্ত রূপ দেখা যাচ্ছে আজ। যদি এই পরিকল্পনা সফল হয়, তবে ইরান হবে পৃথিবীর প্রথম দেশ যারা সম্পূর্ণ আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সচেতনভাবে বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।
ইরানের ভেতরে সাধারণ মানুষ এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষা কার্যক্রম। তবে সরকার তার অবস্থানে অনড়। তাদের ভাষায়, এটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ রক্ষার কৌশল। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহল একে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। প্রশ্ন এখন একটাই—ইরানিরা কি সত্যিই এক অন্ধকার ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে?

