ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভির দেওয়া টানা তিন দিনের বিক্ষোভের ডাকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সাড়া মেলেনি দেশটির অভ্যন্তরে। গত মাসের উত্তাল দিনগুলোর পর রাজধানী তেহরানসহ প্রধান শহরগুলোতে বর্তমানে এক ধরনের থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। শনিবার সন্ধ্যা থেকে সোমবার পর্যন্ত নতুন করে গণজাগরণের যে ডাক পাহলভি দিয়েছিলেন, তার প্রথম দুই দিনে রাজপথে বড় কোনো জমায়েত লক্ষ্য করা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা সাবেক শাহ-পুত্র রেজা পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশবাসীকে আবারও ‘শহর দখলের’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিশেষ করে গত ডিসেম্বরের শেষে শুরু হওয়া আন্দোলন যখন চলতি মাসের ৭ ও ৮ জানুয়ারি চরম সহিংস রূপ নেয়, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হয়তো সময়ের ব্যাপার মাত্র। পাহলভি নিজেও তখন নিজেকে সম্ভাব্য ‘ট্রানজিশনাল নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকেন।
তবে মাঠের বাস্তবতা এখন ভিন্ন। তেহরানের ব্যস্ত সড়কগুলোতে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ফিরতে শুরু করেছে। যদিও আকাশজুড়ে ড্রোন নজরদারি এবং মোড়ে মোড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি এক ধরনের অলিখিত সামরিক শাসনের আবহ তৈরি করে রেখেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ইন্টারনেটের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর চরম দমননীতির কারণে সাধারণ মানুষ এখন আর রাজপথে নামার ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ১৯ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই বিপুল প্রাণহানি এবং ধরপাকড় বিক্ষোভকারীদের মনোবলে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গতকাল শনিবার এক কঠোর হুঁশিয়ারিতে বলেছেন, “উসকানিদাতাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হবে।” সরকারের এই অনমনীয় অবস্থানই সাধারণ মানুষকে ঘরে ফিরতে বাধ্য করেছে।
রেজা পাহলভির রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও ইরানের ভেতরে জনমত স্পষ্টত বিভক্ত। নির্বাসনে থাকা ইরানিদের মধ্যে তার ব্যাপক সমর্থন থাকলেও, দেশের ভেতরে অনেকেই রাজতন্ত্রের ফিরে আসার বিষয়ে সন্দিহান। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হলেও তারা আবারও কোনো একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কবলে পড়তে চাইছে না। মূলত একটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প নেতৃত্বের অভাবই খামেনি সরকারকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারীদের জন্য ‘সহায়তা আসছে’ বলে যে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, তার দৃশ্যমান কোনো প্রতিফলন এখনো ঘটেনি। ফলে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আশায় থাকা সাধারণ মানুষ এখন অনেকটা হতাশ। এই পরিস্থিতিতে রেজা পাহলভির ডাক যে কেবল বিদেশের মাটিতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, তা গত দুই রাতের জনশূন্য তেহরানই বলে দিচ্ছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা সফলভাবে ‘দাঙ্গা’ দমন করেছে এবং পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে। স্কুল-কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আজ রবিবার থেকে পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে এই তথাকথিত স্থিতিশীলতা কতদিন বজায় থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। কারণ অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির যে ক্ষোভ থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল, তার কোনো সমাধান এখনো অধরা।

